ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) – ২য় পর্ব

সংকলন: ডঃ মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব 


বিভিন্ন ছালাতের পরিচয়

১. বিতর ছালাত (صلاة الوتر)

বিতর ছালাত সুন্নাতে মুওয়াক্কাদাহ।[1] যা এশার ফরয ছালাতের পর হ’তে ফজর পর্যন্ত সুন্নাত ও নফল ছালাত সমূহের শেষে আদায় করতে হয়।[2] বিতর ছালাত খুবই ফযীলতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বাড়ীতে বা সফরে কোন অবস্থায় বিতর ও ফজরের দু’রাক‘আত সুন্নাত পরিত্যাগ করতেন না।[3]

‘বিতর’ অর্থ বেজোড়। যা মূলতঃ এক রাক‘আত। কেননা এক রাক‘আত যোগ না করলে কোন ছালাতই বেজোড় হয় না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘রাতের নফল ছালাত দুই দুই (مَثْنَى مَثْنَى)। অতঃপর যখন তোমাদের কেউ ফজর হয়ে যাবার আশংকা করবে, তখন সে যেন এক রাক‘আত পড়ে নেয়। যা তার পূর্বেকার সকল নফল ছালাতকে বিতরে পরিণত করবে’।[4] অন্য হাদীছে তিনি বলেন, اَلْوِتْرُ رَكْعَةٌ مِّنْ آخِرِ اللَّيْلِ ‘বিতর রাত্রির শেষে এক রাক‘আত মাত্র’।[5] আয়েশা (রাঃ) বলেন, وَكَانَ يُوْتِرُ بِوَاحِدَةٍ ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এক রাক‘আত দ্বারা বিতর করতেন’। [6]

রাতের নফল ছালাত সহ বিতর ১, ৩, ৫, ৭, ৯, ১১ ও ১৩ রাক‘আত পর্যন্ত (وَلاَ بِأَكْثَرَ مِنْ ثَلاَثَ عَشْرَةَ) পড়া যায় এবং তা প্রথম রাত্রি, মধ্য রাত্রি, ও শেষ রাত্রি সকল সময় পড়া চলে।[7] যদি কেউ বিতর পড়তে ভুলে যায় অথবা বিতর না পড়ে ঘুমিয়ে যায়, তবে স্মরণ হ’লে কিংবা রাতে বা সকালে ঘুম হ’তে জেগে উঠার পরে সুযোগ মত তা আদায় করবে।[8] অন্যান্য সুন্নাত-নফলের ন্যায় বিতরের ক্বাযাও আদায় করা যাবে।[9] তিন রাক‘আত বিতর একটানা ও এক সালামে পড়াই উত্তম।[10] ৫ রাক‘আত বিতরে একটানা পাঁচ রাক‘আত শেষে বৈঠক ও সালাম সহ বিতর করবে। [11] সাত ও নয় রাক‘আত বিতরে ছয় ও আট রাক‘আতে প্রথম বৈঠক করবে। অতঃপর সপ্তম ও নবম রাক‘আতে শেষ বৈঠক করে সালাম ফিরাবে।[12]

চার খলীফাসহ অধিকাংশ ছাহাবী, তাবেঈ ও মুজতাহিদ ইমামগণ এক রাক‘আত বিতরে অভ্যস্ত ছিলেন।[13] অতএব ‘এক রাক‘আত বিতর সঠিক নয় এবং এক রাক‘আতে কোন ছালাত হয় না’। ‘বিতর তিন রাক‘আতে সীমাবদ্ধ’। ‘বিতর ছালাত মাগরিবের ছালাতের ন্যায়’। ‘তিন রাক‘আত বিতরের উপরে উম্মতের ইজমা হয়েছে’ বলে যেসব কথা সমাজে চালু আছে, শরী‘আতে এর কোন ভিত্তি নেই’।[14] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, তোমরা মাগরিবের ছালাতের ন্যায় (মাঝখানে বৈঠক করে) বিতর আদায় করো না’।[15] উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তিন রাক‘আত বিতরের ১ম রাক‘আতে সূরা আ‘লা, ২য় রাক‘আতে সূরা কাফেরূণ ও ৩য় রাক‘আতে সূরা ইখলাছ পাঠ করতেন। ঐ সাথে ফালাক্ব ও নাস পড়ার কথাও এসেছে।[16] এসময় তিনি শেষ রাক‘আতে ব্যতীত সালাম ফিরাতেন না (وَلاَ يُسَلِّمُ إِلاَّ فِي آخِرِهِنَّ)। [17]

কুনূত (القنوت) :

‘ কুনূত’ অর্থ বিনম্র আনুগত্য। কুনূত দু’প্রকার। কুনূতে রাতেবাহ ও কুনূতে নাযেলাহ। প্রথমটি বিতর ছালাতের শেষ রাক‘আতে পড়তে হয়। দ্বিতীয়টি বিপদাপদ ও বিশেষ কোন যরূরী কারণে ফরয ছালাতের শেষ রাক‘আতে পড়তে হয়। বিতরের কুনূতের জন্য হাদীছে বিশেষ দো‘আ বর্ণিত হয়েছে।[18] বিতরের কুনূত সারা বছর পড়া চলে।[19] তবে মাঝে মধ্যে ছেড়ে দেওয়া ভাল। কেননা বিতরের জন্য কুনূত ওয়াজিব নয়। [20] দো‘আয়ে কুনূত রুকূর আগে ও পরে[21] দু’ভাবেই পড়া জায়েয আছে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে,
أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَّدْعُوَ عَلَى أَحَدٍ أَوْ لِأَحَدٍ قَنَتَ بَعْدَ الرُّكُوْعِ، متفق عليه-
‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন কারো বিরুদ্ধে বা কারো পক্ষে দো‘আ করতেন, তখন রুকূর পরে কুনূত পড়তেন…।[22] ইমাম বায়হাক্বী বলেন,
رُوَاةُ الْقُنُوْتِ بَعْدَ الرُّكُوْعِ أَكْثَرُ وَأَحْفَظُ وَعَلَيْهِ دَرَجَ الْخُلَفَاءُ الرَّاشِدُوْنَ-
‘রুকূর পরে কুনূতের রাবীগণ সংখ্যায় অধিক ও অধিকতর স্মৃতিসম্পন্ন এবং এর উপরেই খুলাফায়ে রাশেদীন আমল করেছেন’। [23] হযরত ওমর, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ, আনাস, আবু হুরায়রা (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবী থেকে বিতরের কুনূতে বুক বরাবর হাত উঠিয়ে দো‘আ করা প্রমাণিত আছে।[24] কুনূত পড়ার জন্য রুকূর পূর্বে তাকবীরে তাহরীমার ন্যায় দু’হাত উঠানো ও পুনরায় বাঁধার প্রচলিত প্রথার কোন বিশুদ্ধ দলীল নেই।[25] ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলকে জিজ্ঞেস করা হ’ল যে, বিতরের কুনূত রুকূর পরে হবে, না পূর্বে হবে এবং এই সময় দো‘আ করার জন্য হাত উঠানো যাবে কি-না। তিনি বললেন, বিতরের কুনূত হবে রুকূর পরে এবং এই সময় হাত উঠিয়ে দো‘আ করবে।[26] ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) বলেন, বিতরের কুনূতের সময় দু’হাতের তালু আসমানের দিকে বুক বরাবর উঁচু থাকবে। ইমাম ত্বাহাবী ও ইমাম কার্খীও এটাকে পসন্দ করেছেন।[27] এই সময় মুক্তাদীগণ ‘আমীন’ ‘আমীন’ বলবেন।[28]

দো‘আয়ে কুনূত (دعاء قنوت الوتر) :

হাসান বিন আলী (রাঃ) বলেন যে, বিতরের কুনূতে বলার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে নিম্নোক্ত দো‘আ শিখিয়েছেন।-
اَللَّهُمَّ اهْدِنِيْ فِيْمَنْ هَدَيْتَ، وَعَافِنِىْ فِيْمَنْ عَافَيْتَ، وَتَوَلَّنِيْ فِيْمَنْ تَوَلَّيْتَ، وَبَارِكْ لِيْ فِيْمَا أَعْطَيْتَ، وَقِنِيْ شَرَّ مَا قَضَيْتَ، فَإِنَّكَ تَقْضِىْ وَلاَ يُقْضَى عَلَيْكَ، إنَّهُ لاَ يَذِلُّ مَنْ وَّالَيْتَ، وَ لاَ يَعِزُّ مَنْ عَادَيْتَ، تَبَارَكْتَ رَبَّنَا وَتَعَالَيْتَ، وَصَلَّى اللهُ عَلَى النَّبِىِّ-
উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাহ্দিনী ফীমান হাদায়তা, ওয়া ‘আ-ফিনী ফীমান ‘আ-ফায়তা, ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লায়তা, ওয়া বা-রিক্লী ফীমা ‘আ‘ত্বায়তা, ওয়া ক্বিনী শার্রা মা ক্বাযায়তা; ফাইন্নাকা তাক্বযী ওয়া লা ইয়ুক্বযা ‘আলায়কা, ইন্নাহূ লা ইয়াযিল্লু মাঁও ওয়া-লায়তা, ওয়া লা ইয়া‘ইয্ঝু মান্ ‘আ-দায়তা, তাবা-রক্তা রববানা ওয়া তা‘আ-লায়তা, ওয়া ছাল্লাল্লা-হু ‘আলান্ নাবী’ ।[29]

জামা‘আতে ইমাম ছাহেব ক্রিয়াপদের শেষে একবচন…‘নী’-এর স্থলে বহুবচন…. ‘না’ বলতে পারেন।[30]

অনুবাদ : হে আল্লাহ! তুমি যাদেরকে সুপথ দেখিয়েছ, আমাকে তাদের মধ্যে গণ্য করে সুপথ দেখাও। যাদেরকে তুমি মাফ করেছ, আমাকে তাদের মধ্যে গণ্য করে মাফ করে দাও। তুমি যাদের অভিভাবক হয়েছ, তাদের মধ্যে গণ্য করে আমার অভিভাবক হয়ে যাও। তুমি আমাকে যা দান করেছ, তাতে বরকত দাও। তুমি যে ফায়ছালা করে রেখেছ, তার অনিষ্ট হ’তে আমাকে বাঁচাও। কেননা তুমি সিদ্ধান্ত দিয়ে থাক, তোমার বিরুদ্ধে কেউ সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। তুমি যার সাথে বন্ধুত্ব রাখ, সে কোনদিন অপমানিত হয় না। আর তুমি যার সাথে দুশমনী কর, সে কোনদিন সম্মানিত হ’তে পারে না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি বরকতময় ও সর্বোচ্চ। আল্লাহ তাঁর নবীর উপরে রহমত বর্ষণ করুন’।

দো‘আয়ে কুনূত শেষে মুছল্লী ‘আল্লাহু আকবার’ বলে সিজদায় যাবে।[31] কুনূতে কেবল দু’হাত উঁচু করবে। মুখে হাত বুলানোর হাদীছ যঈফ।[32] বিতর শেষে তিনবার সরবে ‘সুবহা-নাল মালিকিল কুদ্দূস’ শেষদিকে দীর্ঘ টানে বলবে’।[33] অতঃপর ইচ্ছা করলে বসেই সংক্ষেপে দু’রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করবে এবং সেখানে প্রথম রাক‘আতে সূরা যিলযাল ও দ্বিতীয় রাক‘আতে সূরা কাফেরূণ পাঠ করবে।[34]

উল্লেখ্য যে, اَللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِيْنُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ আল্লা-হুম্মা ইন্না নাস্তা‘ঈনুকা ওয়া নাস্তাগফিরুকা…’ বলে বিতরে যে কুনূত পড়া হয়, সেটার হাদীছ ‘মুরসাল’ বা যঈফ।[35] অধিকন্তু এটি কুনূতে নাযেলাহ হিসাবে বর্ণিত হয়েছে, কুনূতে রাতেবাহ হিসাবে নয়।[36] অতএব বিতরের কুনূতের জন্য উপরে বর্ণিত দো‘আটিই সর্বোত্তম। [37]

ইমাম তিরমিযী বলেন, لاَ نَعْرِفُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْقُنُوْتِ شَيْئًا أَحْسَنَ مِنْ هَذَا ‘নবী করীম (ছাঃ) থেকে কুনূতের জন্য এর চেয়ে কোন উত্তম দো‘আ আমরা জানতে পারিনি’।[38]

কুনূতে নাযেলাহ (قنوت النازلة) :

যুদ্ধ, শত্রুর আক্রমণ প্রভৃতি বিপদের সময় অথবা কারুর জন্য বিশেষ কল্যাণ কামনায় আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে বিশেষভাবে এই দো‘আ পাঠ করতে হয়। ‘কুনূতে নাযেলাহ’ ফজর ছালাতে অথবা সব ওয়াক্তে ফরয ছালাতের শেষ রাক‘আতে রুকূর পরে দাঁড়িয়ে ‘রববানা লাকাল হাম্দ’ বলার পরে দু’হাত উঠিয়ে সরবে পড়তে হয়। [39] কুনূতে নাযেলাহর জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে নির্দিষ্ট কোন দো‘আ বর্ণিত হয়নি। অবস্থা বিবেচনা করে ইমাম আরবীতে[40] দো‘আ পড়বেন ও মুক্তাদীগণ ‘আমীন’ ‘আমীন’ বলবেন। [41] রাসূল (ছাঃ) বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি বা শক্তির বিরুদ্ধে এমনকি এক মাস যাবৎ একটানা বিভিন্নভাবে দো‘আ করেছেন।[42] তবে হযরত ওমর (রাঃ) থেকে এ বিষয়ে একটি দো‘আ বর্ণিত হয়েছে। যা তিনি ফজরের ছালাতে পাঠ করতেন এবং যা বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে দৈনিক পাঁচবার ছালাতে পাঠ করা যেতে পারে। যেমন-
اَللَّهُمَّ اغْفِرْلَنَا وَلِلْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْمُسْلِمِيْنَ وَالْمُسْلِمَاتِ، وَأَلِّفْ بَيْنَ قُلُوْبِهِمْ وَأَصْلِحْ ذَاتَ بَيْنِهِمْ ، وَانْصُرْهُمْ عَلَى عَدُوِّكَ وَعَدُوِّهِمْ، اَللَّهُمَّ الْعَنِ الْكَفَرَةَ الَّذِيْنَ يَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِيْلِكَ وَيُكَذِّبُوْنَ رُسُلَكَ وَيُقَاتِلُوْنَ أَوْلِيَاءَكَ، اَللَّهُمَّ خَالِفْ بَيْنَ كَلِمَتِهِمْ وَزَلْزِِلْ أَقْدَامَهُمْ وَأَنْزِلْ بِهِمْ بَأْسَكَ الَّذِيْ لاَ تَرُدُّهُ عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِيْنَ-
উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগফির লানা ওয়া লিল মু’মিনীনা ওয়াল মু‘মিনা-তি ওয়াল মুসলিমীনা ওয়াল মুসলিমা-তি, ওয়া আল্লিফ বায়না কুলূবিহিম, ওয়া আছলিহ যা-তা বায়নিহিম, ওয়ান্ছুরহুম ‘আলা ‘আদুউবিকা ওয়া ‘আদুউবিহিম। আল্লা-হুম্মাল‘আনিল কাফারাতাল্লাযীনা ইয়াছুদ্দূনা ‘আন সাবীলিকা ওয়া ইয়ুকায্যিবূনা রুসুলাকা ওয়া ইয়ুক্বা-তিলূনা আউলিয়া-আকা। আল্লা-হুম্মা খা-লিফ বায়না কালিমাতিহিম ওয়া ঝালঝিল আক্বদা-মাহুম ওয়া আনঝিল বিহিম বা’সাকাল্লাযী লা তারুদ্দুহূ ‘আনিল ক্বাউমিল মুজরিমীন।

অনুবাদ : হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এবং সকল মুমিন-মুসলিম নর-নারীকে ক্ষমা করুন। আপনি তাদের অন্তর সমূহে মহববত পয়দা করে দিন ও তাদের মধ্যকার বিবাদ মীমাংসা করে দিন। আপনি তাদেরকে আপনার ও তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! আপনি কাফেরদের উপরে লা‘নত করুন। যারা আপনার রাস্তা বন্ধ করে, আপনার প্রেরিত রাসূলগণকে অবিশ্বাস করে ও আপনার বন্ধুদের সাথে লড়াই করে। হে আল্লাহ! আপনি তাদের দলের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে দিন ও তাদের পদসমূহ টলিয়ে দিন এবং আপনি তাদের মধ্যে আপনার প্রতিশোধকে নামিয়ে দিন, যা পাপাচারী সম্প্রদায় থেকে আপনি ফিরিয়ে নেন না’।[43]

অতঃপর প্রথমবার বিসমিল্লাহ… সহ ইন্না নাস্তা‘ঈনুকা …. এবং দ্বিতীয়বার বিসমিল্লাহ… সহ ইন্না না‘বুদুকা …বর্ণিত আছে।[44]

উল্লেখ্য যে, উক্ত ‘কুনূতে নাযেলাহ’ থেকে মধ্যম অংশটুকু অর্থাৎ ইন্না নাস্তা‘ঈনুকা … নিয়ে সেটাকে ‘কুনূতে বিতর’ হিসাবে চালু করা হয়েছে, যা নিতান্তই ভুল। আলবানী বলেন যে, এই দো‘আটি ওমর (রাঃ) ফজরের ছালাতে কুনূতে নাযেলাহ হিসাবে পড়তেন। এটাকে তিনি বিতরের কুনূতে পড়েছেন বলে আমি জানতে পারিনি।[45]

[1] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৪৩; নাসাঈ হা/১৬৭৬; মির‘আত ২/২০৭; ঐ, ৪/২৭৩-৭৪; শাহ অলিউল্লাহ দেহলভী, হুজ্জাতুল্লা-হিল বা-লিগাহ ২/১৭।
[2] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৪৪; ছহীহ আত-তারগীব হা/৫৯২-৯৩।
[3] . ইবনুল ক্বাইয়িম, যা-দুল মা‘আ-দ (বৈরূত : মুওয়াসসাসাতুর রিসালাহ, ২৯ সংস্করণ, ১৪১৬/১৯৯৬) ১/৪৫৬।
[4] . عَنِ ابْنِ عُمَرَ: أَنَّ رَجُلاً سَأَلَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صَلاَةِ اللَّيْلِ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: صَلاَةُ اللَّيْلِ مَثْنَى مَثْنَى، فَإِذَا خَشِيَ أَحَدُكُمُ الصُّبْحَ صَلَّى رَكْعَةً وَاحِدَةً تُوتِرُ لَهُ مَا قَدْ صَلَّى- বুখারী (ফাৎহ সহ) হা/৯৯০ ‘বিতর’ অধ্যায়-১৪; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৫৪ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫।
[5] . মুসলিম, মিশকাত হা/১২৫৫।
[6] . ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৮৫।
[7] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৪৫; আবুদাঊদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৬৩-৬৫; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৬১।
[8] . তিরমিযী, আবুদাঊদ, ইবনু মাজাহ মিশকাত হা/১২৬৮, ১২৭৯; নায়ল ৩/২৯৪, ৩১৭-১৯, মির‘আত ৪/২৭৯।
[9] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৪৮; নায়লুল আওত্বার ৩/৩১৮-১৯।
[10] . মির‘আত ৪/২৭৪; হাকেম ১/৩০৪ পৃঃ।
[11] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৫৬; মির‘আত ৪/২৬২।
[12] . মুসলিম, মিশকাত হা/১২৫৭; বায়হাক্বী ৩/৩০; মির‘আত ৪/২৬৪-৬৫।
[13] . নায়লুল আওত্বার ৩/২৯৬; মির‘আত ৪/২৫৯।
[14] . মিরক্বাত ৩/১৬০-৬১, ১৭০; মির‘আত হা/১২৬২, ১২৬৪, ১২৭৩ -এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্যঃ ৪/২৬০-৬২, ২৭৫।
[15] . দারাকুৎনী হা/১৬৩৪-৩৫; সনদ ছহীহ।
[16] . হাকেম ১/৩০৫, আবুদাঊদ, দারেমী, মিশকাত হা/১২৬৯, ১২৭২।
[17] . নাসাঈ হা/১৭০১, ‘ক্বিয়ামুল লাইল’ অধ্যায়-২০, অনুচ্ছেদ-৩৭; মির‘আত ৪/২৬০।
[18] . তিরমিযী, আবুদাঊদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৭৩।
[19] . প্রাগুক্ত, মিশকাত হা/১২৭৩; মির‘আত ৪/২৮৩; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৪৬।
[20] . আবুদাঊদ, নাসাঈ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১২৯১-৯২ ‘কুনূত’ অনুচ্ছেদ-৩৬; মির‘আত ৪/৩০৮।
[21] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৮৯; ইবনু মাজাহ হা/১১৮৩-৮৪, মিশকাত হা/১২৯৪; মির‘আত ৪/২৮৬-৮৭; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৪৭; আলবানী, ক্বিয়ামু রামাযান পৃঃ ২৩।
[22] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৮৮।
[23] . বায়হাক্বী ২/২০৮; তুহফাতুল আহওয়াযী (কায়রো : ১৪০৭/১৯৮৭) হা/৪৬৩-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য, ২/৫৬৬ পৃঃ।
[24] . বায়হাক্বী ২/২১১-১২; মির‘আত ৪/৩০০; তুহফা ২/৫৬৭।
[25] . ইরওয়াউল গালীল হা/৪২৭; মির‘আত ৪/২৯৯, ‘কুনূত’ অনুচ্ছেদ-৩৬।
[26] . তুহফা ২/৫৬৬; মাসায়েলে ইমাম আহমাদ, মাসআলা নং ৪১৭-২১।
[27] . মির‘আত ৪/৩০০ পৃঃ।
[28] . মির‘আত ৪/৩০৭; ছিফাত ১৫৯ পৃঃ; আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১২৯০।
[29] . সুনানু আরবা‘আহ, দারেমী, মিশকাত হা/১২৭৩ ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫; ইরওয়া হা/৪২৯, ২/১৭২। উল্লেখ্য যে, কুনূতে বর্ণিত উপরোক্ত দো‘আর শেষে ‘দরূদ’ অংশটি আলবানী ‘যঈফ’ বলেছেন। তবে ইবনু মাসঊদ, আবু মূসা, ইবনু আববাস, বারা, আনাস প্রমুখ ছাহাবী থেকে বিতরের কুনূত শেষে রাসূলের উপর দরূদ পাঠ করা প্রমাণিত হওয়ায় তিনি তা পাঠ করা জায়েয হওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন -ইরওয়া ২/১৭৭, তামামুল মিন্নাহ ২৪৬; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৪৭)। ছাহেবে মির‘আত বলেন, ইবনু আবী আছেম ও ছাহেবে মিরক্বাত বলেন, ইবনু হিববান বর্ণিত কুনূতে وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنَتُوْبُ إِلَيْكَ -এসেছে (মির‘আত ৪/২৮৫)। তবে সেটি বর্তমান গবেষণায় প্রমাণিত হয়নি। সেকারণ আমরা এটা ‘মতন’ থেকে বাদ দিলাম।

তবে দো‘আয়ে কুনূতের শেষে ইস্তেগফার সহ যেকোন দো‘আ পাঠের ব্যাপারে অধিকাংশ বিদ্বান মত প্রকাশ করেছেন। কেননা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) কুনূতে কখনো একটি নির্দিষ্ট দো‘আ পড়তেন না, বরং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দো‘আ পড়েছেন (দ্রঃ আলী (রাঃ) বর্ণিত হাদীছ আবুদাঊদ, তিরমিযী প্রভৃতি, মিশকাত হা/১২৭৬; মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে তায়মিয়াহ ২৩/১১০-১১; মির‘আত ৪/২৮৫; লাজনা দায়েমাহ, ফৎওয়া নং ১৮০৬৯; মাজমূ‘ ফাতাওয়া উছায়মীন, ফৎওয়া নং ৭৭৮-৭৯)। তাছাড়া যেকোন দো‘আর শুরুতে হাম্দ ও দরূদ পাঠের বিষয়ে ছহীহ হাদীছে বিশেষ নির্দেশ রয়েছে (আহমাদ, আবুদাঊদ হা/১৪৮১; ছিফাত পৃঃ ১৬২)। অতএব আমরা ‘ইস্তেগফার’ সহ যেকোন দো‘আ ও ‘দরূদ’ দো‘আয়ে কুনূতের শেষে পড়তে পারি।
[30] . আহমাদ, ইরওয়া হা/৪২৯; ছহীহ ইবনু হিববান হা/৭২২; শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায, মাজমূ‘ ফাতাওয়া, প্রশ্নোত্তর সংখ্যা : ২৯০, ৪/২৯৫ পৃঃ।
[31] . আহমাদ, নাসাঈ হা/১০৭৪; আলবানী, ছিফাতু ছালা-তিন্নবী, ১৬০ পৃঃ।
[32] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৪৭; যঈফ আবুদাঊদ হা/১৪৮৫; বায়হাক্বী, মিশকাত হা/২২৫৫ -এর টীকা; ইরওয়াউল গালীল হা/৪৩৩-৩৪, ২/১৮১ পৃঃ।
[33] . নাসাঈ হা/১৬৯৯ সনদ ছহীহ।
[34] . আহমাদ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৮৪, ৮৫, ৮৭; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৯৯৩।
[35] . মারাসীলে আবুদাঊদ হা/৮৯; বায়হাক্বী ২/২১০; মিরক্বাত ৩/১৭৩-৭৪; মির‘আত ৪/২৮৫।
[36] . ইরওয়া হা/৪২৮-এর শেষে, ২/১৭২ পৃঃ।
[37] . মির‘আত হা/১২৮১-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য, ৪/২৮৫ পৃঃ।
[38] . তুহফাতুল আহওয়াযী হা/৪৬৩-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য, ২/৫৬৪ পৃঃ; বায়হাক্বী ২/২১০-১১।
[39] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১২৮৮-৯০; ছিফাত ১৫৯; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৪৮-৪৯।
[40] . মুসলিম, মিশকাত হা/৯৭৮, ‘ছালাতে অসিদ্ধ ও সিদ্ধ কর্ম সমূহ’ অনুচ্ছেদ-১৯; মির‘আত হা/৯৮৫-এর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য, ৩/৩৪২ পৃঃ; শাওকানী, আসসায়লুল জার্রার ১/২২১।
[41] . আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১২৯০; মির‘আত ৪/৩০৭; ছিফাত ১৫৯ পৃঃ।
[42] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/১২৮৮-৯১।
[43] . বায়হাক্বী ২/২১০-১১। বায়হাক্বী অত্র হাদীছকে ‘ছহীহ মওছূল’ বলেছেন।
[44] . বায়হাক্বী ২/২১১ পৃঃ।
[45] . ইরওয়াউল গালীল হা/৪২৮, ২/১৭২ পৃঃ।

২. তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ (صلاة الليل)


রাত্রির বিশেষ নফল ছালাত তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ নামে পরিচিত। রামাযানে এশার পর প্রথম রাতে পড়লে তাকে ‘তারাবীহ’ এবং রামাযান ও অন্যান্য সময়ে শেষরাতে পড়লে তাকে ‘তাহাজ্জুদ’ বলা হয়।

তারাবীহ : মূল ধাতু رَاحَةٌ (রা-হাতুন) অর্থ : প্রশান্তি। অন্যতম ধাতু رَوْحٌ (রাওহুন) অর্থ : সন্ধ্যারাতে কোন কাজ করা। সেখান থেকে ترويحة (তারবীহাতুন) অর্থ : সন্ধ্যারাতের প্রশান্তি বা প্রশান্তির বৈঠক; যা রামাযান মাসে তারাবীহর ছালাতে প্রতি চার রাক‘আত শেষে করা হয়ে থাকে। বহুবচনে (التراويح) ‘তারা-বীহ’ অর্থ : প্রশান্তির বৈঠকসমূহ (আল-মুনজিদ)

তাহাজ্জুদ : মূল ধাতু هُجُوْدٌ (হুজূদুন) অর্থ : রাতে ঘুমানো বা ঘুম থেকে উঠা। সেখান থেকে تَهَجُّدٌ (তাহাজ্জুদুন) পারিভাষিক অর্থে রাত্রিতে ঘুম থেকে জেগে ওঠা বা রাত্রি জেগে ছালাত আদায় করা (আল-মুনজিদ)।

উল্লেখ্য যে, তারাবীহ, তাহাজ্জুদ, ক্বিয়ামে রামাযান, ক্বিয়ামুল লায়েল সবকিছুকে এক কথায় ‘ছালাতুল লায়েল’ বা ‘রাত্রির নফল ছালাত’ বলা হয়। রামাযানে রাতের প্রথমাংশে যখন জামা‘আত সহ এই নফল ছালাতের প্রচলন হয়, তখন প্রতি চার রাক‘আত অন্তর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হ’ত। সেখান থেকে ‘তারাবীহ’ নামকরণ হয় (ফাৎহুল বারী, আল-ক্বামূসুল মুহীত্ব)। এই নামকরণের মধ্যেই তাৎপর্য নিহিত রয়েছে যে, তারাবীহ প্রথম রাতে একাকী অথবা জামা‘আত সহ এবং তাহাজ্জুদ শেষরাতে একাকী পড়তে হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রামাযানের রাতে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ দু’টিই পড়েছেন মর্মে ছহীহ বা যঈফ সনদে কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না’। [1]

রাত্রির ছালাতের ফযীলত : রাত্রির ছালাত বা ‘ছালাতুল লায়েল’ নফল হ’লেও তা খুবই ফযীলতপূর্ণ। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

أَفْضَلُ الصَّلاَةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلاَةُ اللَّيْلِ، رَوَاهُ مُسْلِمٌ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ-

‘ফরয ছালাতের পরে সর্বোত্তম ছালাত হ’ল রাত্রির (নফল) ছালাত’।[2] তিনি আরও বলেন,

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِيْنَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْآخِرُ فَيَقُوْلُ مَن يَّدْعُوْنِي فَأَسْتَجِيْبَ لَهُ، مَنْ يَّسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَن يَّسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ، مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ- وَفِىْ رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ عَنْهُ: فَلاَ يَزَالُ كَذَالِكَ حَتَّى يُضِيْئَ الْفَجْرُ-

‘আমাদের পালনকর্তা মহান আল্লাহ প্রতি রাতের তৃতীয় প্রহরে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, কে আছ আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছ আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব? এভাবে তিনি ফজর স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত আহবান করেন’। [3]

তারাবীহর জামা‘আত : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রামাযান মাসের ২৩, ২৫ ও ২৭ তিন রাত্রি মসজিদে জামা‘আতের সাথে তারাবীহর ছালাত আদায় করেছেন। প্রথম দিন রাত্রির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত, দ্বিতীয় দিন অর্ধ রাত্রি পর্যন্ত এবং তৃতীয় দিন নিজের স্ত্রী-পরিবার ও মুছল্লীদের নিয়ে সাহারীর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ছালাত আদায় করেন। [4] পরের রাতে মুছল্লীগণ তাঁর কক্ষের কাছে গেলে তিনি বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছি যে, এটি তোমাদের উপর ফরয হয়ে যায় কি-না (خَشِيْتُ أَنْ يُّكْتَبَ عَلَيْكُمْ)। আর যদি ফরয হয়ে যায়, তাহ’লে তোমরা তা আদায় করতে পারবে না’…। [5]

তারাবীহর ফযীলত : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, 

مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ 

‘যে ব্যক্তি রামাযানের রাত্রিতে ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় রাত্রির ছালাত আদায় করে, তার বিগত সকল গোনাহ মাফ করা হয়’।[6]

তারাবীহর জামা‘আত ঈদের জামা‘আতের ন্যায় :

ইমাম শাফেঈ, আবু হানীফা, আহমাদ ও কিছু মালেকী বিদ্বান এবং অন্যান্য বিদ্বানগণ বলেন, তারাবীহর ছালাত জামা‘আতে পড়া উত্তম, যা ওমর (রাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরাম চালু করে গেছেন এবং এর উপরেই মুসলমানদের আমল জারি আছে। কেননা এটি ইসলামের প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহের (لأنه من الشعائر الظاهرة) অন্তর্ভুক্ত। যা ঈদায়নের ছালাতের সাথে সামঞ্জস্যশীল’।[7]

রাক‘আত সংখ্যা : রামাযান বা রামাযানের বাইরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’তে রাত্রির এই বিশেষ নফল ছালাত তিন রাক‘আত বিতরসহ ১১ রাক‘আত ছহীহ সূত্র সমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। যেমন আয়েশা (রাঃ) বলেন,

مَا كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزِيْدُ فِيْ رَمَضَانَ وَلاَ فِيْ غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً، يُصَلِّيْ أَرْبَعًا فَلاَ تَسْأَلْْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُوْلِهِنَّ ثُمَّ يُصَلِّيْ أَرْبَعًا فَلاَ تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُوْلِهِنَّ ثُمَّ يُصَلِّيْ ثَلاَثًا، متفق عليه-

অর্থ : রামাযান বা রামাযানের বাইরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাত্রির ছালাত এগার রাক‘আতের বেশী আদায় করেননি। তিনি প্রথমে (২+২) [8] চার রাক‘আত পড়েন। তুমি তার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিনি (২+২) চার রাক‘আত পড়েন। তুমি তার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিন রাক‘আত পড়েন।[9]

বন্ধ হওয়ার পরে পুনরায় জামা‘আত চালু : সম্ভবত: নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী খেলাফতের উপরে আপতিত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে ১ম খলীফা হযরত আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ)-এর সংক্ষিপ্ত খেলাফতকালে (১১-১৩ হিঃ) তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করা সম্ভবপর হয়নি। ২য় খলীফা হযরত ওমর ফারূক (রাঃ) স্বীয় যুগে (১৩-২৩ হিঃ) রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে এবং বহু সংখ্যক মুছল্লীকে মসজিদে বিক্ষিপ্তভাবে উক্ত ছালাত আদায় করতে দেখে রাসূল (ছাঃ)-এর রেখে যাওয়া সুন্নাত অনুসরণ করে তাঁর খেলাফতের ২য় বর্ষে ১৪ হিজরী সনে মসজিদে নববীতে ১১ রাক‘আতে তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করেন।[10] যেমন সায়েব বিন ইয়াযীদ (রাঃ) বলেন,

أَمَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ وَتَمِيْمًا الدَّارِيَّ أَنْ يَّقُوْمَا لِلنَّاسِ فِىْ رَمَضَانَ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً…. رواه في المؤطأ بإسناد صحيح-

‘খলীফা ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হযরত উবাই ইবনু কা‘ব ও তামীম দারী (রাঃ)-কে রামাযানের রাত্রিতে ১১ রাক‘আত ছালাত জামা‘আত সহকারে আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেন। এই ছালাত(إلي فُرُوْعِ الْفَجْرِ) ফজরের প্রাক্কাল (সাহারীর পূর্ব) পর্যন্ত দীর্ঘ হ’ত’।[11]

বিশ রাক‘আত তারাবীহ : প্রকাশ থাকে যে, উক্ত রেওয়ায়াতের পরে ইয়াযীদ বিন রূমান থেকে ‘ওমরের যামানায় ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়া হ’ত’ বলে যে বর্ণনা এসেছে, তা ‘যঈফ’ এবং ২০ রাক‘আত সম্পর্কে ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে ‘মরফূ’ সূত্রে যে বর্ণনা এসেছে, তা ‘মওযূ’ বা জাল।[12] এতদ্ব্যতীত ২০ রাক‘আত তারাবীহ সম্পর্কে কয়েকটি ‘আছার’ এসেছে, যার সবগুলিই ‘যঈফ’।[13] ২০ রাক‘আত তারাবীহর উপরে ওমরের যামানায় ছাহাবীগণের মধ্যে ‘ইজমা’ বা ঐক্যমত হয়েছে বলে যে দাবী করা হয়, তা একেবারেই ভিত্তিহীন ও বাতিল কথা (بَاطِلَةٌ جِدًّا) মাত্র। [14] তিরমিযীর ভাষ্যকার খ্যাতনামা ভারতীয় হানাফী মনীষী দারুল উলূম দেউবন্দ-এর তৎকালীন সময়ের মুহতামিম (অধ্যক্ষ) আনোয়ার শাহ কাষ্মীরী (১২৯২-১৩৫২/১৮৭৫-১৯৩৩ খৃঃ) বলেন, একথা না মেনে উপায় নেই যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর তারাবীহ ৮ রাক‘আত ছিল। [15]

এটা স্পষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও খুলাফায়ে রাশেদীন থেকে এবং রাসূল (ছাঃ)-এর অন্য কোন স্ত্রী ও ছাহাবী থেকে ১১ বা ১৩ রাক‘আতের ঊর্ধ্বে তারাবীহ বা তাহাজ্জুদের কোন বিশুদ্ধ প্রমাণ নেই।[16] বর্ধিত রাক‘আত সমূহ পরবর্তীকালে সৃষ্ট। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাত্রির ছালাত ১১ বা ১৩ রাক‘আত আদায় করতেন। পরবর্তীকালে মদীনার লোকেরা দীর্ঘ ক্বিয়ামে দুর্বলতা বোধ করে। ফলে তারা রাক‘আত সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে, যা ৩৯ রাক‘আত পর্যন্ত পৌঁছে যায়’।[17] অথচ বাস্তব কথা এই যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) যেমন দীর্ঘ ক্বিয়াম ও ক্বিরাআতের মাধ্যমে তিন রাত জামা‘আতের সাথে তারাবীহর ছালাত আদায় করেছেন, তেমনি সংক্ষিপ্ত ক্বিয়ামেও তাহাজ্জুদের ছালাত আদায় করেছেন। যা সময় বিশেষে ৯, ৭ ও ৫ রাক‘আত হ’ত। কিন্তু তা কখনো ১১ বা ১৩ -এর ঊর্ধ্বে প্রমাণিত হয়নি।[18] তিনি ছিলেন ‘সৃষ্টিজগতের প্রতি রহমত স্বরূপ’ (আম্বিয়া ২১/১০৭) এবং বেশী না পড়াটা ছিল উম্মতের প্রতি তাঁর অন্যতম রহমত।

শৈথিল্যবাদ : অনেক বিদ্বান উদারতার নামে ‘বিষয়টি প্রশস্ত’ (الأمر واسع) বলে শৈথিল্য প্রদর্শন করেন এবং ২৩ রাক‘আত পড়েন ও বলেন শত রাক‘আতের বেশীও পড়া যাবে, যদি কেউ ইচ্ছা করে। দলীল হিসাবে ইবনু ওমর (রাঃ) বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদীছটি পেশ করেন যে, ‘রাত্রির ছালাত দুই দুই (مَثْنَى مَثْنَى) করে। অতঃপর ফজর হয়ে যাবার আশংকা হ’লে এক রাক‘আত পড়। তাতে পিছনের সব ছালাত বিতরে (বেজোড়ে) পরিণত হবে’।[19] অত্র হাদীছে যেহেতু রাক‘আতের কোন সংখ্যাসীমা নেই এবং রাসূল (ছাঃ)-এর কথা তাঁর কাজের উপর অগ্রাধিকারযোগ্য, অতএব যত রাক‘আত খুশী পড়া যাবে। তবে তারা সবাই একথা বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ১১ রাক‘আত পড়েছেন এবং সেটা পড়াই উত্তম। অথচ উক্ত হাদীছের অর্থ হ’ল, রাত্রির নফল ছালাত (দিনের ন্যায়) চার-চার নয়, বরং দুই-দুই রাক‘আত করে। [20] তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা ছালাত

আদায় কর, যেভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখছ’।[21] এ কথার মধ্যে তাঁর ছালাতের ধরন ও রাক‘আত সংখ্যা সবই গণ্য। তাঁর উপরোক্ত কথার ব্যাখ্যা হ’ল তাঁর কর্ম, অর্থাৎ ১১ রাক‘আত ছালাত। অতএব ইবাদত বিষয়ে তাঁর কথা ও কর্মে বৈপরীত্য ছিল, এরূপ ধারণা নিতান্তই অবাস্তব।

এক্ষণে যখন সকল বিদ্বান এ বিষয়ে একমত যে, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ১১ রাক‘আত পড়তেন এবং কখনো এর ঊর্ধ্বে পড়েননি এবং এটা পড়াই উত্তম, তখন তারা কেন ১১ রাক‘আতের উপর আমলের ব্যাপারে একমত হ’তে পারেন না? কেন তারা শতাধিক রাক‘আত পড়ার ব্যাপারে উদারতা দেখিয়ে ফের ২৩ রাক‘আতে সীমাবদ্ধ থাকেন? এটা উম্মতকে ছহীহ হাদীছের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া থেকে বিরত রাখার নামান্তর বৈ-কি!

এক্ষণে যদি কেউ রাতে অধিক ইবাদত করতে চান এবং কুরআন অধিক মুখস্থ না থাকে, তাহ’লে দীর্ঘ রুকূ ও সুজূদ সহ ১১ রাক‘আত তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ শেষ করে দীর্ঘক্ষণ ধরে তাসবীহ ও কুরআন তিলাওয়াতে রত থাকতে পারেন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও অধিক ছওয়াবের কাজ। এছাড়াও রয়েছে যেকোন সাধারণ নফল ছালাত আদায়ের সুযোগ। যেমন ছালাতুল হাজত, ছালাতুত তাওবাহ, তাহিইয়াতুল ওযূ, তাহিইয়াতুল মাসজিদ ইত্যাদি।

অতএব রাতের নফল ছালাত ১১ বা ১৩ রাক‘আতই সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও সর্বোত্তম। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রতি দু’রাক‘আত অন্তর সালাম ফিরিয়ে আট রাক‘আত তারাবীহ শেষে কখনও এক, কখনও তিন, কখনও পাঁচ রাক‘আত বিতর এক সালামে পড়তেন। [22] জেনে রাখা ভাল যে, রাক‘আত গণনার চেয়ে ছালাতের খুশূ-খুযূ ও দীর্ঘ সময় ক্বিয়াম, কু‘ঊদ, রুকূ, সুজূদ অধিক যরূরী। যা আজকের মুসলিম সমাজে প্রায় লোপ পেতে বসেছে। ফলে রাত্রির নিভৃত ছালাতের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।

জামা‘আতে তারাবীহ কি বিদ‘আত?

রামাযানের প্রতি রাতে নিয়মিত জামা‘আতে তারাবীহ পড়াকে অনেকে বিদ‘আত মনে করেন। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মাত্র তিনদিন জামা‘আতে তারাবীহ পড়েছিলেন [23] এবং ওমর ফারূক (রাঃ) নিয়মিত জামা‘আতে তারাবীহ চালু করার পরে একে ‘সুন্দর বিদ‘আত’(نِعْمَتِ الْبِدْعَةُ هٰذِهِ) বলেছিলেন।[24] এর জবাব এই যে, ওমর ফারূক (রাঃ) এটিকে আভিধানিক অর্থে বিদ‘আত বলেছিলেন, শারঈ অর্থে নয়। কেননা শারঈ বিদ‘আত সর্বতোভাবেই ভ্রষ্টতা। যার পরিণাম জাহান্নাম। তিনি এজন্য বিদ‘আত বলেন যে, এটিকে রাসূল (ছাঃ) কায়েম করার পরে ফরয হওয়ার আশংকায় পরিত্যাগ করেন।[25] আবুবকর (রাঃ) পুনরায় চালু করেননি। অতঃপর দীর্ঘ বিরতির পরে চালু হওয়ায় বাহ্যিক কারণে তিনি এটাকে ‘কতই না সুন্দর বিদ‘আত’ অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ)-এর পরে পুনঃপ্রচলন বলে প্রশংসা করেন।[26]

এক নযরে রাতের নফল ছালাতের নিয়ম সমূহ :

(১) ১১ রাক‘আত : দুই দুই করে ৮ রাক‘আত। অতঃপর তিন রাক‘আত পড়ে শেষ বৈঠক করবে।[27] রামাযান ও অন্য সময়ে এটা ছিল রাসূলূল্লাহ (ছাঃ) -এর অধিকাংশ রাতের আমল।

(২) ১১ রাক‘আত : দুই দুই করে মোট ১০ রাক‘আত। অতঃপর এক রাক‘আত বিতর।[28]

(৩) ১৩ রাক‘আত : দুই দুই করে ৮ রাক‘আত। অতঃপর একটানা পাঁচ রাক‘আত বিতর। অথবা দুই দুই করে ১০ রাক‘আত, অতঃপর ৩ রাক‘আত বিতর। অথবা দুই দুই করে ১২ রাক‘আত, অতঃপর ১ রাক‘আত বিতর।[29]

(৪) ৯ রাক‘আত : একটানা ৮ রাক‘আত পড়ে প্রথম বৈঠক ও নবম রাক‘আতে শেষ বৈঠক। অথবা দুই দুই করে ৬ রাক‘আত। অতঃপর তিন রাক‘আত বিতর। অথবা দুই দুই করে ৮ রাক‘আত। অতঃপর ১ রাক‘আত বিতর।[30]

(৫) ৭ রাক‘আত : একটানা ৬ রাক‘আত পড়ে প্রথম বৈঠক ও সপ্তম রাক‘আতে শেষ বৈঠক। অথবা দুই দুই করে ৪ রাক‘আত। অতঃপর ৩ রাক‘আত বিতর। অথবা দুই দুই করে ৬ রাক‘আত। অতঃপর এক রাক‘আত বিতর।[31]

(৬) ৫ রাক‘আত : একটানা ৫ রাক‘আত বিতর অথবা দুই দুই করে ৪ রাক‘আত। অতঃপর এক রাক‘আত বিতর।[32]

ইমাম মুহাম্মাদ বিন নছর আল-মারওয়াযী বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে একটানা একাধিক রাক‘আত বিতর পড়ার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু দুই দুই রাক‘আত পড়ে সালাম ফিরানো ও শেষে এক রাক‘আত-এর মাধ্যমে বিতর করাকেই আমরা উত্তম মনে করি। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জনৈক প্রশ্নকারীকে এধরনের জবাবই দিয়েছিলেন যে, ‘রাতের ছালাত দুই দুই। অতঃপর যখন তুমি ফজর হয়ে যাবার আশংকা করবে, তখন এক রাক‘আত পড়ে নাও, যা তোমার পিছনের সব ছালাতকে বিতরে পরিণত করবে’। [33]

উপরের ৬টি নিয়মের মধ্যে প্রথমটি কেবল তিনি তারাবীহ ও তাহাজ্জুদে পড়েছেন। বাকীগুলি বিভিন্ন সময় তাহাজ্জুদে পড়েছেন। বৃদ্ধাবস্থায় কিংবা সময় কম থাকলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কখনো কখনো কমসংখ্যক রাক‘আতে তাহাজ্জুদ পড়তেন। উম্মতের জন্য এটি বিশেষ অনুগ্রহ বটে। বৃদ্ধকালে ভারী হয়ে যাওয়ায় তিনি অধিকাংশ (রাতের নফল) ছালাত বসে বসে পড়তেন।[34]

এক্ষণে ২৩, ২৫ ও ২৭শে রামাযানের যে বেজোড় তিন রাত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জামা‘আত সহ তারাবীহ পড়েছিলেন, সে তিন রাত কত রাক‘আত পড়েছিলেন? জবাব এই যে, সেটা ছিল আট রাক‘আত তারাবীহ ও বাকীটা বিতর। যেমন হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে এসেছে-

صَلَّى بِنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْ شَهْرِ رَمَضَانَ ثَمَانَ رَكْعَاتٍ وَالْوِتْرَ-

‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের নিয়ে রামাযানে ছালাত আদায় করলেন আট রাক‘আত এবং বিতর পড়লেন।[35]

জাবের (রাঃ) বর্ণিত উক্ত হাদীছে বিতরের রাক‘আত সংখ্যা বলা হয়নি। কিন্তু আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছের শেষে স্পষ্টভাবে তিন রাক‘আত বিতরের কথা এসেছে, যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে।[36] অতএব ৮+৩=১১ রাক‘আত তারাবীহ জামা‘আত সহকারে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাত হিসাবে সাব্যস্ত হয়। হযরত ওমর (রাঃ) সেটাই পুনরায় চালু করেছিলেন। তিনি মোর্দা সুন্নাত যেন্দা করেছিলেন। তিনি ‘সুন্নাতে হাসানাহ’ করেছিলেন, ‘বিদ‘আতে হাসানাহ’ করেননি। কেননা শারঈ বিদ‘আত সবটুকু ভ্রষ্টতা। সেখানে ভাল-মন্দ ভাগ নেই। বরং শারঈ বিদ‘আতকে ‘হাসানাহ’ ও ‘সাইয়েআহ’ দু’ভাগে ভাগ করাটাই আরেকটি বিদ‘আত। আল্লাহ আমাদেরকে বিদ‘আত হ’তে রক্ষা করুন!

উল্লেখ্য যে, হাদীছে বিতর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ‘যখন তুমি ফজর হয়ে যাবার আশংকা করবে, তখন এক রাক‘আত পড়ে নাও। তাহ’লে পিছনের ছালাত গুলি বিতরে পরিণত হবে’।[37] এতে বুঝা যায় যে, একটানা বা দুই দুই করে পড়লেও সেটা শেষের এক রাক‘আতের মাধ্যমে বিতরে পরিণত হবে। [38] আর একারণেই ইমাম হাকেম (রহঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে ১৩, ১১, ৯, ৭, ৫, ৩, ও ১ রাক‘আত বিতর প্রমাণিত আছে। তবে সবচেয়ে বিশুদ্ধতর হ’ল এক রাক‘আত।[39] অর্থাৎ তারাবীহ ও বিতর পৃথক নয়। বরং শেষে এক রাক‘আত যোগ করলে সবটাকেই ‘বিতর’ বলা যায় ও সবটাকেই ‘ছালাতুল লায়েল’ বা ‘রাতের ছালাত’ বলা যায়।

রাত্রির ছালাত সম্পর্কে জ্ঞাতব্য (معلومات في صلاة الليل) :

(১) শেষ রাতে তাহাজ্জুদে উঠে প্রথমে হালকাভাবে দু’রাক‘আত পড়বে। অতঃপর বাকী ছালাত পড়বে।[40] (২) যদি কেউ প্রথম রাতে এশার পরে বিতর পড়ে ঘুমিয়ে যায়, তবে শেষ রাতে উঠে দু’রাক‘আত করে তাহাজ্জুদ পড়বে। শেষে আর বিতর পড়তে হবে না। কেননা এক রাতে দুই বিতর চলে না।[41] (৩) বিতর ক্বাযা হয়ে গেলে সকালে অথবা যখন স্মরণ বা সুযোগ হবে, তখন পড়বে’। [42] এটি ‘মুবাহ’ (ইচ্ছাধীন, বাধ্যতামূলক নয়)।[43] (৪) তাহাজ্জুদ বা বিতর ক্বাযা হয়ে গেলে ‘উবাদাহ বিন ছামিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ, আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস প্রমুখ ছাহাবীগণ ফজর ছালাতের আগে তা আদায় করে নিতেন। [44] (৫) বিতর পড়ে শুয়ে গেলে এবং ঘুম অথবা ব্যথার আধিক্যের কারণে তাহাজ্জুদ পড়তে না পারলে রাসূল (ছাঃ) দিনের বেলায় (সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে) ১২ রাক‘আত পড়েছেন (তন্মধ্যে তাহাজ্জুদের ৮ রাক‘আত ও ছালাতুয যোহা ৪ রাক‘আত)। [45] (৬) যদি কেউ আগ রাতে বিতরের পর দু’রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করে এবং শেষরাতে তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে সক্ষম না হয়, তাহ’লে উক্ত দু’রাক‘আত তার জন্য যথেষ্ট হবে’।[46] (৭) ‘যদি কেউ তাহাজ্জুদের নিয়তে শুয়ে গেলেও উঠতে না পারে, তাহ’লে সে উত্তম নিয়তের কারণে পূর্ণ নেকী পাবে এবং উক্ত ঘুম তার জন্য ছাদাক্বা হবে’।[47] ‘যদি কেউ পীড়িত হয় বা সফরে থাকে, তাহ’লে বাড়ীতে সুস্থ অবস্থায় সে যে নেক আমল করত, সেইরূপ ছওয়াব তার জন্য লেখা হবে’।[48] আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে অব্যাহত পুরস্কার’। [49] (৮) রাতের নফল ছালাত নিয়মিত আদায় করা উচিত। কেননা ‘যেকোন নেক আমল তা যত কমই হৌক, নিয়মিত করাই আল্লাহর নিকট অধিক পসন্দনীয়’।[50] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তুমি ঐ ব্যক্তির মত হয়ো না, যে রাতের নফল ছালাতে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু পরে ছেড়ে দিয়েছে’।[51] তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহ ঐ স্বামী-স্ত্রীর উপর রহম করুন, যারা তাহাজ্জুদে ওঠার জন্য পরস্পরের মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়, যদি একজন আপত্তি করে’।[52] (৯) তাহাজ্জুদের ক্বিরাআত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কখনো সশব্দে কখনো নিঃশব্দে পড়েছেন।[53] তিনি বলেন, সরবে ও নীরবে পাঠকারী প্রকাশ্যে ও গোপনে ছাদাক্বাকারীর ন্যায়।[54] তিনি আবুবকর (রাঃ)-কে কিছুটা জোরে এবং ওমর (রাঃ)-কে কিছুটা আস্তে ক্বিরাআত করার উপদেশ দেন।[55] (১০) তারাবীহর জন্য নির্দিষ্ট কোন দো‘আ নেই। তবে শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলিতে পড়ার জন্য আয়েশা (রাঃ)-কে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বিশেষ একটি দো‘আ শিক্ষা দিয়েছিলেন। সেটি হ’ল, اَللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّيْ আল্লা-হুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউভুন তোহেববুল ‘আফ্ওয়া ফা‘ফু ‘আন্নী’ (হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল। তুমি ক্ষমা করতে ভালবাস। অতএব আমাকে ক্ষমা কর)। [56] (১১) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা মনের প্রফুল্লতা নিয়ে ছালাত আদায় কর এবং সাধ্যমত নেক আমল কর, বিরক্তি বোধ না করা পর্যন্ত’।[57] (১২) মা আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি জানিনা যে, আল্লাহর নবী (ছাঃ) কখনো এক রাত্রিতে সমস্ত কুরআন খতম করেছেন কিংবা ফজর অবধি সারা রাত্রি ব্যাপী (নফল) ছালাত আদায় করেছেন।[58]

তাহাজ্জুদে উঠে দো‘আ (ما يقول إذا قام من الليل) :

(ক) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ রাত্রে জাগ্রত হয় ও নিম্নের দো‘আ পাঠ করে এবং আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, তা কবুল করা হয়। আর যদি সে ওযূ করে এবং ছালাত আদায় করে, সেই ছালাত কবুল করা হয়’। দো‘আটি হ’ল :

لآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لآ شَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ، سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ ِللهِ وَلآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ وَلآ حَوْلَ وَلآ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ-

উচ্চারণ : লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দাহু লা শারীকা লাহু; লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর। সুবহা-নাল্লা-হি ওয়াল হামদু লিল্লা-হি ওয়ালা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াল্লা-হু আকবার; ওয়ালা হাওলা ওয়ালা ক্বুউওয়াতা ইল্লা বিল্লা-হ। অতঃপর বলবে, ‘রবিবগফির্লী’ (প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা কর)। অথবা অন্য প্রার্থনা করবে।

অনুবাদ : আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। তাঁর জন্যই সকল রাজত্ব ও তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা এবং তিনিই সকল কিছুর উপরে ক্ষমতাশালী। মহা পবিত্র আল্লাহ। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আল্লাহ সবার চেয়ে বড়। নেই কোন ক্ষমতা নেই কোন শক্তি আল্লাহ ব্যতীত’। [59] এছাড়া অন্যান্য দো‘আও পড়তেন।[60]

(খ) স্ত্রী মায়মূনা (রাঃ)-এর ঘরে তাহাজ্জুদের ছালাতে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি সূরা আলে ইমরানের ১৯০ আয়াত (إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ… لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ) থেকে সূরার শেষ অর্থাৎ ২০০ আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন’ (বু: মু:)। একবার সফরে রাতে ঘুম থেকে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সূরা আলে ইমরান ১৯১-৯৪ আয়াত (رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً….. إِنَّكَ لاَ تُخْلِفُ الْمِيْعَادَ) পাঠ করেছেন (নাসাঈ)। একবার তিনি (গুরুত্ব বিবেচনা করে) সূরা মায়েদাহ ১১৮ আয়াতটি (إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيْزُ الْحَكِيْمُ) দিয়ে পুরা তাহাজ্জুদের ছালাত শেষ করেন’ (নাসাঈ)। [61]

(গ) তাহাজ্জুদের ছালাতে রাসূল (ছাঃ) বিভিন্ন ‘ছানা’ পড়েছেন।[62] তন্মধ্য হ’তে যে কোন ‘ছানা’ পড়া চলে। তবে আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাতে যখন তাহাজ্জুদে দাঁড়াতেন, তখন তাকবীরে তাহরীমার পর নিম্নের দো‘আটি পড়তেন-

اَللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ قَيِّمُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيْهِنَّ، وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ نُوْرُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيْهِنَّ، وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ مَلِكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيْهِنَّ، وَلَكَ الْحَمْدُ، أَنْتَ الْحَقُّ وَوَعْدُكَ حَقٌّ وَلِقَاؤُكَ حَقٌّ وَقَوْلُكَ حَقٌّ، وَعَذَابُ الْقَبْرِ حَقٌّ وَالْجَنَّةُ حَقٌّ وَالنَّارُ حَقٌّ، وَالنَّبِيُّوْنَ حَقٌّ وَمُحَمَّدٌ حَقٌّ وَالسَّاعَةُ حَقٌّ، اَللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ وَبِكَ خَاصَمْتُ وَإِلَيْكَ حَاكَمْتُ، فَاغْفِرْ لِىْ مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَّرْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي، أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ لآ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ وَلآ إِلَهَ غَيْرُكَ-

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা লাকাল হামদু আনতা ক্বাইয়িমুস সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরযি ওয়া মান ফীহিন্না, ওয়ালাকাল হামদু আনতা নূরুস সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরযি ওয়া মান ফীহিন্না, ওয়ালাকাল হামদু আনতা মালিকুস সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরযি ওয়া মান ফীহিন্না; ওয়া লাকাল হামদু, আনতাল হাক্কু, ওয়া ওয়া‘দুকা হাক্কুন, ওয়া লিক্বা-উকা হাক্কুন, ওয়া ক্বাওলুকা হাক্কুন; ওয়া ‘আযা-বুল ক্বাবরে হাক্কুন, ওয়াল জান্নাতু হাক্কুন, ওয়ান্না-রু হাক্কুন; ওয়ান নাবিইয়ূনা হাক্কুন, ওয়া মুহাম্মাদুন হাক্কুন, ওয়াস সা-‘আতু হাক্কুন। আল্লা-হুম্মা লাকা আসলামতু ওয়া বিকা আ-মানতু, ওয়া ‘আলাইকা তাওয়াক্কালতু, ওয়া ইলাইকা আনাবতু, ওয়া বিকা খা-ছামতু, ওয়া ইলাইকা হা-কামতু, ফাগফিরলী মা ক্বাদ্দামতু ওয়া মা আখ্খারতু, ওয়া মা আসরারতু ওয়া মা আ‘লানতু, ওয়া মা আনতা আ‘লামু বিহী মিন্নী; আনতাল মুক্বাদ্দিমু ওয়া আনতাল মুওয়াখখিরু, লা ইলা-হা ইল্লা আনতা, ওয়া লা ইলা-হা গাইরুকা।

অর্থঃ ‘হে আল্লাহ! তোমার জন্য যাবতীয় প্রশংসা, তুমি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং এ সবের মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছুর ধারক। তোমারই জন্য সমস্ত প্রশংসা, তুমি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং এ সবের মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছুর জ্যোতি। তোমারই জন্য সমস্ত প্রশংসা, তুমি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং এ সবের মধ্যে যা আছে সবকিছুর বাদশাহ। তোমারই জন্য সমস্ত প্রশংসা, তুমিই সত্য, তোমার ওয়াদা সত্য, তোমার সাক্ষাত লাভ সত্য, তোমার বাণী সত্য, কবর আযাব সত্য, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, নবীগণ সত্য, মুহাম্মাদ সত্য এবং ক্বিয়ামত সত্য। হে আল্লাহ! আমি তোমারই নিকট আত্মসমর্পণ করি, তোমারই উপর ভরসা করি ও তোমার দিকেই প্রত্যাবর্তন করি। আমি তোমার জন্যই ঝগড়া করি এবং তোমার কাছেই ফায়ছালা পেশ করি। অতএব তুমি আমার পূর্বাপর, গোপন ও প্রকাশ্য সকল অপরাধ ক্ষমা কর। তুমি অগ্র ও পশ্চাতের মালিক। তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং তুমি ব্যতীত কোন মা‘বূদ নেই।[63]


[1] . মির‘আত ৪/৩১১ পৃঃ, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭।
[2] . মুসলিম, মিশকাত হা/২০৩৯ ‘ছওম’ অধ্যায়-৭, ‘নফল ছিয়াম’ অনুচ্ছেদ-৬।
[3] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২২৩, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘রাত্রি জাগরণে উৎসাহ দান’ অনুচ্ছেদ-৩৩; মুসলিম হা/১৭৭৩।
[4] . আবুদাঊদ, তিরমিযী প্রভৃতি, মিশকাত হা/১২৯৮ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭।
[5] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৯৫ ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭।
[6] . মুসলিম, মিশকাত হা/১২৯৬ ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭।
[7] . শাওকানী, নায়লুল আওত্বার ‘তারাবীহর ছালাত’ অনুচ্ছেদ, ৩/৩২১।
[8] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১১৮৮ ‘রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১।
[9] . (১) বুখারী ১/১৫৪ পৃঃ, হা/১১৪৭; (২) মুসলিম ১/২৫৪ পৃঃ, হা/১৭২৩; (৩) তিরমিযী হা/৪৩৯; (৪) আবুদাঊদ হা/১৩৪১; (৫) নাসাঈ হা/১৬৯৭; (৬) মুওয়াত্ত্বা, পৃঃ ৭৪, হা/২৬৩; (৭) আহমাদ হা/২৪৮০১; (৮) ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১১৬৬; (৯) বুলূগুল মারাম হা/৩৬৭; (১০) তুহফাতুল আহওয়াযী হা/৪৩৭; (১১) বায়হাক্বী ২/৪৯৬ পৃঃ, হা/৪৩৯০; (১২) ইরওয়াউল গালীল হা/৪৪৫-এর ভাষ্য, ২/১৯১-১৯২; (১৩) মির‘আতুল মাফাতীহ হা/১৩০৬-এর ভাষ্য, ৪/৩২০-২১।
[10] . মির‘আত ২/২৩২ পৃঃ; ঐ, ৪/৩১৫-১৬ ও ৩২৬ পৃঃ।
[11] . (১) মুওয়াত্ত্বা (মুলতান, পাকিস্তান: ১৪০৭/১৯৮৬) ৭১ পৃঃ, ‘রামাযানে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ; মুওয়াত্ত্বা, মিশকাত হা/১৩০২ ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭; মির‘আত হা/১৩১০, ৪/৩২৯-৩০, ৩১৫ পৃঃ; (২) বায়হাক্বী ২/৪৯৬, হা/৪৩৯২; (৩) মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ (বোম্বাই, ১৩৯৯/১৯৭৯) ২/৩৯১ পৃঃ, হা/৭৭৫৩; (৪) ত্বাহাভী শরহ মা‘আনিল আছার হা/১৬১০।
[12] . আলবানী, হাশিয়া মিশকাত হা/১৩০২, ১/৪০৮ পৃঃ; ইরওয়া হা/৪৪৬, ৪৪৫, ২/১৯৩, ১৯১ পৃ:।
[13] . তারাবীহর রাক‘আত বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য মির‘আত হা/১৩১০ -এর আলোচনা দ্রষ্টব্য, ৪/৩২৯-৩৫ পৃঃ; ইরওয়া হা/৪৪৬-এর আলোচনা দ্রঃ ২/১৯৩ পৃঃ।
[14] . তুহফাতুল আহওয়াযী হা/৮০৩-এর আলোচনা দ্রঃ ৩/৫৩১ পৃঃ; মির‘আত ৪/৩৩৫।
[15] . كَانَتْ ثَمَانِيَةَ رَكْعَاتٍ) r (وَلاَ مَنَاصَ مِنْ تَسْلِيْمٍ أَنَّ تَرَاوِيْحَهُ আল-‘আরফুশ শাযী শরহ তিরমিযী হা/৮০৬-এর আলোচনা, দ্রঃ ২/২০৮ পৃঃ; মির‘আত ৪/৩২১।
[16] . মুওয়াত্ত্বা, ৭১ পৃঃ, টীকা-৮ দ্রষ্টব্য।
[17] . ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া (মক্কা: আননাহযাতুল হাদীছাহ ১৪০৪/১৯৮৪), ২৩/১১৩।
[18] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১১৮৮ ‘রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১; আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১২৬৪ ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫, আয়েশা (রাঃ) হ’তে; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১১৯৫, ‘রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১, ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে।
[19] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৫৪, ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫।
[20] . কেননা অত্র হাদীছের রাবী ইবনু ওমর (রাঃ) দিনের নফল ছালাত এক সালামে চার রাক‘আত করে পড়তেন। -মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা হা/৬৬৯৮, ২/২৭৪, সনদ ছহীহ, আলবানী, তামামুল মিন্নাহ পৃঃ ২৪০; বায়হাক্বী, মা‘রিফাতুস সুনান ওয়াল আ-ছা-র হা/১৪৩১, ৪/১৯২। ছহীহ বুখারীর বর্ণনায় (হা/৯৯০) এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) খুৎবা দিচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, রাত্রির ছালাত কিভাবে পড়তে হবে? জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, দুই দুই করে। ভাষ্যকার ইবনু হাজার বলেন, জবাবে এটা স্পষ্ট হয় যে, ঐ ব্যক্তি রাক‘আত সংখ্যা অথবা (চার রাক‘আত) পৃথকভাবে না মিলিয়ে পড়তে হবে, সেকথা জিজ্ঞেস করেছিল’ (ফাৎহুল বারী হা/৯৯০ ‘বিতর’ অধ্যায়-১৪, ২/৫৫৫-৫৬; মির‘আত ৪/২৫৬)।
[21] . বুখারী হা/৬৩১; ঐ, মিশকাত হা/৬৮৩ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘দেরীতে আযান’ অনুচ্ছেদ-৬।
[22] . আবুদাঊদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৬৪-৬৫ ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫।
[23] . আবুদাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৯৮ ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭।
[24] . বুখারী হা/২০১০; ঐ, মিশকাত হা/১৩০১ অনুচ্ছেদ-৩৭; মির‘আত হা/১৩০৯, ৪/৩২৬-২৭।
[25] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৯৫ ‘রামাযান মাসে রাত্রি জাগরণ’ অনুচ্ছেদ-৩৭; আবুদাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৯৮।
[26] . মির‘আত ২/২৩২ পৃঃ; ঐ, ৪/৩২৭।
[27] . বুখারী হা/১১৪৭; মুসলিম হা/১৭২৩ ও অন্যান্য।
[28] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১১৮৮ ‘রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১।
[29] . মুসলিম, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১২৫৬, ১২৬৪ ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫; মুসলিম, মিশকাত হা/১১৯৭, ‘রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১।
[30] . মুসলিম, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১২৫৭, ১২৬৪ ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫; মুসলিম, মিশকাত হা/১১৯৬; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, আবুদাঊদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৫৪, ১২৬৫।
[31] . আবুদাঊদ হা/১৩৪২; ঐ, মিশকাত হা/১২৬৪; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৫৪।
[32] . আবুদাঊদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৬৫; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৫৪।
[33] . বুখারী হা/৪৭২-৭৩, ৯৯০; মুসলিম হা/১৭৫১; মিশকাত হা/১২৫৪, ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫।
[34] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১১৯৮, ‘রাতের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১।
[35] . ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১০৭০ ‘সনদ হাসান’ ২/১৩৮ পৃঃ; আলবানী, ছালাতুত তারাবীহ হা/৯, ২১ পৃঃ; মির‘আত ৪/৩২০।
[36] . দ্র: টীকা ৭৯৩; বুখারী হা/১১৪৭; মুসলিম হা/১৭২৩ প্রভৃতি।
[37] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৫৪, ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫।
[38] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৪৫-৪৬ পৃঃ।
[39] . মুস্তাদরাক হাকেম ১/৩০৬।
[40] . মুসলিম, মিশকাত হা/১১৯৩-৯৪, ৯৭, ‘রাতের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১।
[41] . আবুদাঊদ, নাসাঈ প্রভৃতি (لاَ وِتْرَانِ فِىْ لَيْلَةٍ) নায়ল, ‘বিতর’ অধ্যায় ৩/৩১৪-১৭ পৃঃ; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৫৬৭।
[42] . তিরমিযী, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১২৬৮, ১২৭৯ ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৫৬২-৬৩; মির‘আত ৪/২৭৯।
[43] . নায়লুল আওত্বার ৩/৩১৭-১৯।
[44] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৮৩।
[45] . মির‘আত ৪/২৬৬; মুসলিম, মিশকাত হা/১২৫৭, ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫।
[46] . দারেমী, মিশকাত হা/১২৮৬; ছহীহাহ হা/১৯৯৩।
[47] . নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, ইরওয়া হা/৪৫৪।
[48] . বুখারী, মিশকাত হা/১৫৪৪ ‘জানায়েয’ অধ্যায়-৫, অনুচ্ছেদ-১।
[49] . হা-মীম সাজদাহ ৪১/৮, তীন ৯৫/৬।
[50] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৪২, ‘কাজে মধ্যপন্থা অবলম্বন’ অনুচ্ছেদ-৩৪।
[51] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৩৪, ‘রাত্রি জাগরণে উৎসাহ দান’ অনুচ্ছেদ-৩৩।
[52] . আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/১২৩০, ‘রাত্রি জাগরণে উৎসাহ দান’ অনুচ্ছেদ-৩৩।
[53] . আবুদাঊদ হা/২২৬; তিরমিযী হা/৪৪৯; মিশকাত হা/১২০২-০৩, ‘রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১।
[54] . নাসাঈ, আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/২২০২, ‘কুরআনের ফাযায়েল’ অধ্যায়-৮, অনুচ্ছেদ-১।
[55] . আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১২০৪, ‘রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১।
[56] . আহমাদ, ইবনু মাজাহ, তিরমিযী, মিশকাত হা/২০৯১ ‘ছওম’ অধ্যায়-৭, ‘ক্বদরের রাত্রি’ অনুচ্ছেদ-৮।
[57] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১২৪৩-৪৪ ‘কাজে মধ্যপন্থা অবলম্বন’ অনুচ্ছেদ-৩৪।
[58] . মুসলিম, মিশকাত হা/১২৫৭, ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫।
[59] . বুখারী, মিশকাত হা/১২১৩ ‘রাত্রিতে উঠে তাহাজ্জুদে কি বলবে’ অনুচ্ছেদ-৩২।
[60] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১১৯৫; আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১২০০, ‘রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১।
[61] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১১৯৫; নাসাঈ, মিশকাত হা/১২০৯; নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২০৫, ‘রাত্রির ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১; আহমাদ হা/২১৩৬৬; মির‘আত ৪/১৯১।
[62] . মুসলিম, আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১২১২, ১৪, ১৭; নাসাঈ হা/১৬১৭ ইত্যাদি।
[63] . আবুদাঊদ হা/৭৭২; ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১১৫১-৫২; বুখারী হা/৬৩১৭; মুসলিম হা/১৮০৮; মিশকাত -আলবানী, হা/১২১১ ‘রাত্রিতে উঠে তাহাজ্জুদে কি বলবে’ অনুচ্ছেদ-৩২; মির‘আত হা/১২১৮।


৩. সফরের ছালাত (الصلاة في السفر)


সফর অথবা ভীতির সময়ে ছালাতে ‘ক্বছর’ করার অনুমতি রয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন-

وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوْا مِنَ الصَّلاَةِ إِنْ خِفْتُمْ أَن يَّفْتِنَكُمُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا إِنَّ الْكَافِرِيْنَ كَانُوا لَكُمْ عَدُوًّا مُبِِيْنًا- (النساء 101)-

অর্থ : ‘যখন তোমরা সফর কর, তখন তোমাদের ছালাতে ‘ক্বছর’ করায় কোন দোষ নেই। যদি তোমরা আশংকা কর যে, কাফেররা তোমাদেরকে উত্যক্ত করবে। নিশ্চয়ই কাফেররা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’ (নিসা ৪/১০১)।

‘ক্বছর’ অর্থ কমানো। পারিভাষিক অর্থে : চার রাক‘আত বিশিষ্ট ছালাত দু’রাক‘আত করে পড়াকে ‘ক্বছর’ বলে। মক্কা বিজয়ের সফরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ক্বছরের সাথে ছালাত আদায় করেন।[1] শান্তিপূর্ণ সফরে ক্বছর করতে হবে কি-না এ সম্পর্কে ওমর ফারূক (রাঃ)-এর এক প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, 

صَدَقَةٌ تَصَدَّقَ اللهُ بِهَا عَلَيْكُمْ فَاقْبَلُوْا صَدَقَتَهُ-

‘আল্লাহ এটিকে তোমাদের জন্য ছাদাক্বা (উপঢৌকন) হিসাবে প্রদান করেছেন। অতএব তোমরা তা গ্রহণ কর’।[2] সফর অবশ্যই আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্যের সফর হ’তে হবে, গোনাহের সফর নয়’। [3]

সফরের দূরত্ব (مسافة السفر) :

সফরের দূরত্বের ব্যাপারে বিদ্বানগণের মধ্যে এক মাইল হ’তে ৪৮ মাইলের বিশ প্রকার বক্তব্য রয়েছে।[4] পবিত্র কুরআনে দূরত্বের কোন ব্যাখ্যা নেই। কেবল সফরের কথা আছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকেও এর কোন সীমা নির্দেশ করা হয়নি। [5] অতএব সফর হিসাবে গণ্য করা যায়, এরূপ সফরে বের হ’লে নিজ বাসস্থান থেকে বেরিয়ে কিছুদূর গেলেই ‘ক্বছর’ করা যায়। কোন কোন বিদ্বানের নিকটে সফরের নিয়ত করলে ঘর থেকেই ‘ক্বছর’ শুরু করা যায়। তবে ইবনুল মুনযির বলেন যে, সফরের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনা শহর ছেড়ে বের হয়ে যাওয়ার পূর্বে ‘ক্বছর’ করেছেন বলে আমি জানতে পারিনি’। তিনি বলেন, বিদ্বানগণ একমত হয়েছেন যে, সফরের নিয়তে বের হয়ে নিজ গ্রাম (বা মহল্লার) বাড়ীসমূহ অতিক্রম করলেই তিনি ক্বছর করতে পারেন।[6]

আমরা মনে করি যে, মতভেদ এড়ানোর জন্য ঘর থেকেই দু’ওয়াক্তের ফরয ছালাত ক্বছর ও সুন্নাত ছাড়াই পৃথক দুই এক্বামতের মাধ্যমে জমা করে সফরে বের হওয়া ভাল। তাবূকের অভিযানে রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবীগণ এটা করেছিলেন।[7]

আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ১৯ দিন (মক্কা বিজয় অথবা তাবূক অভিযানে) অবস্থানকালে ‘ক্বছর’ করেছেন। আমরাও তাই করি। তার বেশী হ’লে পুরা করি।[8] যদি কারু সফরের মেয়াদ নির্দিষ্ট থাকে, তথাপি তিনি ‘ক্বছর’ করবেন, যতক্ষণ না তিনি সেখানে স্থায়ী বসবাসের সংকল্প করেন।[9] সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় ১৯ দিনের বেশী হ’লেও ‘ক্বছর’ করা যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাবূক অভিযানের সময় সেখানে ২০ দিন যাবৎ ‘ক্বছর’ করেন। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) আযারবাইজান সফরে গেলে পুরা বরফের মৌসুমে সেখানে আটকে যান ও ছ’মাস যাবৎ ক্বছরের সাথে ছালাত আদায় করেন। অনুরূপভাবে হযরত আনাস (রাঃ) শাম বা সিরিয়া সফরে এসে দু’বছর সেখানে থাকেন ও ক্বছর করেন। [10]

অতএব স্থায়ী মুসাফির যেমন জাহায, বিমান, ট্রেন, বাস ইত্যাদির চালক ও কর্মচারীগণ সফর অবস্থায় সর্বদা ছালাতে ক্বছর করতে পারেন এবং তারা দু’ওয়াক্তের ছালাত জমা ও ক্বছর করতে পারেন।

মোটকথা ভীতি ও সফর অবস্থায় ‘ক্বছর’ করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সফরে সর্বদা ক্বছর করতেন। হযরত ওমর, আলী, ইবনু মাসঊদ, ইবনু আববাস (রাঃ) প্রমুখ সফরে ক্বছর করাকেই অগ্রাধিকার দিতেন।[11] হযরত ওছমান ও হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রথম দিকে ক্বছর করতেন ও পরে পুরা পড়তেন। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) জামা‘আতে পুরা পড়তেন ও একাকী ক্বছর করতেন।[12] কেননা আল্লাহ বলেন, ‘সফর অবস্থায় ছালাতে ‘ক্বছর’ করলে তোমাদের জন্য কোন গোনাহ নেই’ (নিসা ৪/ ১০১)।

ছালাত জমা ও ক্বছর করা (الجمع بين الصلاتين والقصر) :

সফরে থাকা অবস্থায় যোহর-আছর (২+২=৪ রাক‘আত) ও মাগরিব-এশা (৩+২=৫ রাক‘আত) পৃথক এক্বামতের মাধ্যমে সুন্নাত ও নফল ছাড়াই জমা ও ক্বছর করে তাক্বদীম ও তাখীর দু’ভাবে পড়ার নিয়ম রয়েছে।[13] অর্থাৎ শেষের ওয়াক্তের ছালাত আগের ওয়াক্তের সাথে ‘তাক্বদীম’ করে অথবা আগের ওয়াক্তের ছালাত শেষের ওয়াক্তের সাথে ‘তাখীর’ করে একত্রে পড়বে।[14]

ভীতি ও ঝড়-বৃষ্টি ছাড়াও অন্য কোন বিশেষ শারঈ ওযর বশতঃ মুক্বীম অবস্থায়ও দু’ওয়াক্তের ছালাত ক্বছর ও সুন্নাত ছাড়াই একত্রে জমা করে পড়া যায়। যেমন যোহর ও আছর পৃথক এক্বামতের মাধ্যমে ৪+৪=৮(ثَمَانِيًا) এবং মাগরিব ও এশা অনুরূপভাবে ৩+৪=৭(سَبْعًا) রাক‘আত। ইবনু আববাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হ’ল, এটা কেন? তিনি বললেন, যাতে উম্মতের কষ্ট না হয়’।[15]

ইস্তেহাযা বা প্রদর রোগগ্রস্ত মহিলা ও বহুমূত্রের রোগী বা অন্যান্য কঠিন রোগী, বাবুর্চী এবং কর্মব্যস্ত ভাই-বোনেরা মাঝে-মধ্যে বিশেষ ওযর বশতঃ সাময়িকভাবে এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন।[16]

হজ্জের সফরে আরাফাতের ময়দানে কোনরূপ সুন্নাত-নফল ছাড়াই যোহর ও আছর একত্রে (২+২) যোহরের আউয়াল ওয়াক্তে পৃথক এক্বামতে ‘জমা তাক্বদীম’ করে এবং মুযদালিফায় মাগরিব ও এশা একত্রে (৩+২) এশার সময় পৃথক এক্বামতে ‘জমা তাখীর’ করে জামা‘আতের সাথে অথবা একাকী পড়তে হয়। [17]

সফরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সুন্নাত সমূহ পড়তেন না। [18]

অবশ্য বিতর, তাহাজ্জুদ ও ফজরের দু’রাক‘আত সুন্নাত ছাড়তেন না। [19]

তবে সাধারণ নফল ছালাত যেমন তাহিইয়াতুল ওযূ, তাহিইয়াতুল মাসজিদ ইত্যাদি আদায়ে তিনি কাউকে নিষেধ করতেন না। [20]


[1] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৩৬ ‘সফরের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪১।
[2] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৩৩৫ ‘সফরের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪১।
[3] . মির‘আত ৪/৩৮১।
[4] . শাওকানী, নায়লুল আওত্বার ৪/১২২ পৃঃ; আলোচনা দ্রষ্টব্য, সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৬৩।
[5] . ইবনুল ক্বাইয়িম, যা-দুল মা‘আদ (বৈরুত: ১৪১৬/১৯৯৬) ১/৪৬৩ পৃঃ।
[6] . নায়লুল আওত্বার ৪/১২৪; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৩।
[7] . আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১৩৪৪ ‘সফরের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪১।
[8] . বুখারী ১/১৪৭, হা/৪২৯৮; ঐ, মিশকাত হা/১৩৩৭।
[9] . সাইয়িদ সাবিক্ব, ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৩।
[10] . মিরক্বাত ৩/২২১; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৩-১৪।
[11] . ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২৪/৯৮; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১২।
[12] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৪৭-৪৮ ‘সফরের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪১।
[13] . বুখারী, মিশকাত হা/১৩৩৯; আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১৩৪৪।
[14] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৫।
[15] .(أَرَادَ أَنْ لاَ يُحْرِجَ أُمَّتَهُ) বুখারী হা/১১৭৪ ‘তাহাজ্জুদ’ অধ্যায়-১৯, অনুচ্ছেদ-৩০; মুসলিম হা/১৬৩৩-৩৪; নায়লুল আওত্বার ৪/১৩৬; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৮।
[16] . নায়লুল আওত্বার ৪/১৩৬-৪০; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৭-১৮।
[17] . বুখারী, মিশকাত হা/২৬১৭, ২৬০৭ ‘হজ্জ’ অধ্যায়, ‘আরাফা ও মুযদালিফা থেকে প্রত্যাবর্তন’ অনুচ্ছেদ-৫; আহমাদ, মুসলিম, নাসাঈ, নায়ল ৪/১৪০।
[18] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৩৮ ‘সফরের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪১; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৬।
[19] . ইবনুল ক্বাইয়িম, যা-দুল মা‘আদ ৩/৪৫৭ পৃঃ।
[20] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৪০; বুখারী হা/১১৫৯; নায়ল ৪/১৪২; যা-দুল মা‘আদ ১/৪৫৬।


৪. জুম‘আর ছালাত (صلاة الجمعة)


সূচনা : ১ম হিজরীতে জুম‘আ ফরয হয় এবং হিজরতকালে ক্বোবা ও মদীনার মধ্যবর্তী বনু সালেম বিন ‘আওফ গোত্রের ‘রানূনা’ (رانوناء) উপত্যকায় সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জুম‘আর ছালাত আদায় করেন।[1] যাতে একশত মুছল্লী শরীক ছিলেন।[2] তবে হিজরতের পূর্বে মদীনার আনছারগণ আপোষে পরামর্শক্রমে ইহুদী ও নাছারাদের সাপ্তাহিক ইবাদতের দিনের বিপরীতে নিজেদের জন্য একটি ইবাদতের দিন ধার্য করেন ও সেমতে আস‘আদ বিন যুরারাহ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে মদীনার বনু বায়াযাহ গোত্রের নাক্বী‘উল খাযেমাত (نَقِيعُ الْخَضِمَاتِ) নামক স্থানের ‘নাবীত’ (هَزْمُ النَّبِيْتِ) সমতল ভূমিতে সর্বপ্রথম জুম‘আর ছালাত চালু হয়। যেখানে চল্লিশ জন মুছল্লী যোগদান করেন।[3] অতঃপর হিজরতের পর জুম‘আ ফরয করা হয়।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, জুম‘আর এই দিনটি প্রথমে ইয়াহূদ-নাছারাদের উপরে ফরয করা হয়েছিল। কিন্তু তারা এ বিষয়ে মতভেদ করে। তখন আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে এই দিনের প্রতি (অহীর মাধ্যমে) হেদায়াত দান করেন। এক্ষণে সকল মানুষ আমাদের পশ্চাদানুসারী। ইহুদীরা পরের দিন (শনিবার) এবং নাছারারা তার পরের দিন (রবিবার)…। [4] যেহেতু আল্লাহ শনিবারে কিছু সৃষ্টি করেননি এবং আরশে স্বীয় আসনে সমাসীন হন, সেহেতু ইহুদীরা এদিনকে তাদের সাপ্তাহিক ইবাদতের দিন হিসাবে বেছে নেয়। যেহেতু আল্লাহ রবিবারে সৃষ্টির সূচনা করেন, সেহেতু নাছারাগণ এ দিনটিকে পসন্দ করে। এভাবে তারা আল্লাহর নির্দেশের উপর নিজেদের যুক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়। পক্ষান্তরে জুম‘আর দিনে সকল সৃষ্টিকর্ম সম্পন্ন হয় এবং সর্বশেষ সৃষ্টি হিসাবে আদমকে পয়দা করা হয়। তাই এ দিনটি হ’ল সকল দিনের সেরা। এই দিনটি মুসলিম উম্মাহর সাপ্তাহিক ইবাদতের দিন হিসাবে নির্ধারিত হওয়ায় বিগত সকল উম্মতের উপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। [5] কা‘ব বিন মালেক (রাঃ) অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আযানের আওয়ায শুনে বিগলিত হৃদয়ে বলতেন, ‘আল্লাহ রহম করুন আস‘আদ বিন যুরারাহর উপর, সেই-ই প্রথম আমাদের নিয়ে জুম‘আর ছালাত কায়েম করে রাসূল (ছাঃ)-এর মক্কা থেকে আগমনের পূর্বে। [6]

শহরে হৌক বা গ্রামে হৌক জুম‘আর ছালাত প্রত্যেক বয়স্ক পুরুষ ও জ্ঞানসম্পন্ন মুসলমানের উপরে জামা‘আত সহ আদায় করা ‘ফরযে আয়েন’।[7] তবে গোলাম, রোগী, মুসাফির, শিশু ও মহিলাদের উপরে জুম‘আ ফরয নয়। [8] বাহরায়েন বাসীর প্রতি এক লিখিত ফরমানে খলীফা ওমর (রাঃ) বলেন, جَمِّعُوْا حَيْثُمَا كُنْتُمْ ‘তোমরা যেখানেই থাক, জুম‘আ আদায় কর’।[9] অতএব দু’জন মুসলমান কোন স্থানে থাকলেও তারা একত্রে জুম‘আ আদায় করবে।[10] একজনে খুৎবা দিবে। যদি খুৎবা দিতে অপারগ হয়, তাহ’লে দু’জনে একত্রে জুম‘আর দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে। [11] কারাবন্দী অবস্থায় অনুমতি পেলে করবে, নইলে করবে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় কর’ (তাগাবুন ৬৪/১৬)।

গুরুত্ব (أهمية الجمعة) :

(১) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘হে মুসলমানগণ! জুম‘আর দিনকে আল্লাহ তোমাদের জন্য (সাপ্তাহিক) ঈদের দিন হিসাবে নির্ধারণ করেছেন (جَعَلَهُ اللهُ عِيْدًا)। তোমরা এদিন মিসওয়াক কর, গোসল কর ও সুগন্ধি লাগাও’।[12] 
(২) অতএব জুম‘আর দিন সুন্দরভাবে গোসল করে সাধ্যমত উত্তম পোষাক ও সুগন্ধি লাগিয়ে আগেভাগে মসজিদে যাবে।[13] 
(৩) মসজিদে প্রবেশ করে সামনের কাতারের দিকে এগিয়ে যাবে[14] এবং বসার পূর্বে প্রথমে দু’রাক‘আত ‘তাহিইয়াতুল মাসজিদ’ আদায় করবে। [15] দুনিয়ার সকল গৃহের ঊর্ধ্বে আল্লাহর গৃহের সম্মান। তাই এ গৃহে প্রবেশ করে বসার পূর্বেই আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের সিজদা করতে হয়। আল্লাহ সবচাইতে খুশী হন বান্দা যখন সিজদা করে। কিন্তু যারা সিজদা না করেই বসে পড়ে, তারা আল্লাহ ও আল্লাহর গৃহের প্রতি অসম্মান করে এবং রাসূল (ছাঃ)-এর অবাধ্যতা করে। 
(৪) অতঃপর খত্বীব মিম্বরে বসার আগ পর্যন্ত যত রাক‘আত খুশী নফল ছালাতে মগ্ন থাকবে। [16] 
(৫) এরপর চুপচাপ মনোযোগ সহকারে খুৎবা শুনবে।[17] 
(৬) খুৎবা চলা অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করলে কেবল দু’রাক‘আত ‘তাহিইয়াতুল মাসজিদ’ সংক্ষেপে আদায় করে বসে পড়বে।[18] 
(৭) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জুম‘আ থেকে অলসতাকারীদের ঘর জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।[19] 
(৮) তিনি বলেন, জুম‘আ পরিত্যাগকারীদের হৃদয়ে আল্লাহ মোহর মেরে দেন। অতঃপর তারা গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়’।[20] 
(৯) তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি অবহেলা ভরে পরপর তিন জুম‘আ পরিত্যাগ করল, সে ব্যক্তি ইসলামকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করল’।[21] 
(১০) অন্য বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি বিনা ওযরে তিন জুম‘আ পরিত্যাগ করল, সে ব্যক্তি ‘মুনাফিক’।[22]

ফযীলত (فضل يوم الجمعة) :

(১) জুম‘আর দিন হ’ল ‘দিন সমূহের সেরা’ (سيد الأيام)। এদিন আল্লাহর নিকটে ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের দিনের চাইতেও মহিমান্বিত। এইদিন নিকটবর্তী ফেরেশতাগণ, আকাশ, পৃথিবী, বায়ু, পাহাড়, সমুদ্র সবই ক্বিয়ামত হবার ভয়ে ভীত থাকে’।[23]

(২) জুম‘আর রাতে বা দিনে কোন মুসলিম মারা গেলে আল্লাহ তাকে কবরের ফিৎনা হ’তে বাঁচিয়ে দেন’।[24]

(৩) এইদিন আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। এইদিন তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয় ও এইদিন তাঁকে জান্নাত থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। এদিনে তাঁর তওবা কবুল হয় এবং এদিনেই তাঁর মৃত্যু হয়। এইদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে ও ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে।

(৪) এদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপরে বেশী বেশী দরূদ পাঠ করতে হয়।[25]

(৫) এই দিন ইমামের মিম্বরে বসা হ’তে জামা‘আতে ছালাত শেষে সালাম ফিরানো পর্যন্ত সময়ের মধ্যে[26] এমন একটি সংক্ষিপ্ত সময় (سَاعَةٌ خَفِيْفَةٌ) রয়েছে, যখন বান্দার যেকোন সঙ্গত প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেন।[27] দো‘আ কবুলের এই সময়টির মর্যাদা লায়লাতুল ক্বদরের ন্যায় বলে হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জুম‘আর সমস্ত দিনটিই ইবাদতের দিন। অন্য হাদীছের [28] বক্তব্য অনুযায়ী ঐদিন আছর ছালাতের পর হ’তে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দো‘আ কবুলের সময়কাল প্রলম্বিত। অতএব জুম‘আর সারাটা দিন দো‘আ-দরূদ, তাসবীহ-তেলাওয়াত ও ইবাদতে কাটিয়ে দেওয়া উচিত।[29] এই সময় খত্বীব স্বীয় খুৎবায় এবং ইমাম ও মুক্তাদীগণ স্ব স্ব সিজদায় ও শেষ বৈঠকে তাশাহ্হুদ ও দরূদের পরে সালামের পূর্বে আল্লাহর নিকটে প্রাণ খুলে দো‘আ করবেন। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এই সময়ে বেশী বেশী দো‘আ করতেন।[30]

(৬) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুম‘আর দিন গোসল করে সুগন্ধি মেখে মসজিদে এল ও সাধ্যমত নফল ছালাত আদায় করল। অতঃপর চুপচাপ ইমামের খুৎবা শ্রবণ করল ও জামা‘আতে ছালাত আদায় করল, তার পরবর্তী জুম‘আ পর্যন্ত এবং আরও তিনদিনের গোনাহ মাফ করা হয়’।[31]

(৭) তিনি আরও বলেন, ‘জুম‘আর দিন ফেরেশতাগণ মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন ও মুছল্লীদের নেকী লিখতে থাকেন। এদিন সকাল সকাল যারা আসে, তারা উট কুরবানীর সমান নেকী পায়। তার পরবর্তীগণ গরু কুরবানীর, তার পরবর্তীগণ ছাগল কুরবানীর, তার পরবর্তীগণ মুরগী কুরবানীর ও তার পরবর্তীগণ ডিম কুরবানীর সমান নেকী পায়। অতঃপর খত্বীব দাঁড়িয়ে গেলে ফেরেশতাগণ দফতর গুটিয়ে ফেলেন ও খুৎবা শুনতে থাকেন’।[32]

(৮) তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুম‘আর দিন ভালভাবে গোসল করে। অতঃপর সকাল সকাল মসজিদে যায় পায়ে হেঁটে, গাড়ীতে নয় এবং আগে ভাগে নফল ছালাত শেষে ইমামের কাছাকাছি বসে ও মনোযোগ দিয়ে খুৎবার শুরু থেকে শুনে এবং অনর্থক কিছু করে না, তার প্রতি পদক্ষেপে এক বছরের ছিয়াম ও ক্বিয়ামের অর্থাৎ দিনের ছিয়াম ও রাতের বেলায় নফল ছালাতের সমান নেকী হয়’।[33]

জুম‘আর আযান (أذان الجمعة) :

খত্বীব ছাহেব মিম্বরে বসার পরে মুওয়ায্যিন জুম‘আর আযান দিবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ), আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-এর যুগে এবং ওছমান (রাঃ)-এর খেলাফতের প্রথমার্ধ্বে এই নিয়ম চালু ছিল। অতঃপর মুসলমানের সংখ্যা ও নগরীর ব্যস্ততা বেড়ে গেলে হযরত ওছমান (রাঃ) জুম‘আর পূর্বে মসজিদে নববী থেকে দূরে ‘যাওরা’ (زوراء) বাজারে একটি বাড়ীর ছাদে দাঁড়িয়ে লোকদের আগাম হুঁশিয়ার করার জন্য পৃথক একটি আযানের নির্দেশ দেন।[34] খলীফার এই হুকুম ছিল স্থানিক প্রয়োজনের কারণে একটি সাময়িক নির্দেশ মাত্র। সেকারণ মক্কা, কূফা ও বছরা সহ ইসলামী খেলাফতের বহু গুরুত্বপূর্ণ শহরে এ আযান তখন চালু হয়নি। হযরত ওছমান (রাঃ) এটাকে সর্বত্র চালু করার প্রয়োজন মনে করেননি বা উম্মতকে বাধ্য করেননি। তাই সর্বদা সর্বত্র এই নিয়ম চালু করার পিছনে কোন যুক্তি নেই। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আচরিত সুন্নাতের অনুসরণই সকল মুমিনের কর্তব্য।

ডাক আযান :

ওমর ইবনু আলী আল-ফাকেহানী (৬৫৪-৭৩৪/১২৫৬-১৩৩৪ খৃঃ) বলেন যে, ডাক আযান প্রথম বছরায় চালু করেন যিয়াদ এবং মক্কায় চালু করেন হাজ্জাজ। আর আমার কাছে এখন খবর পৌঁছেছে যে, নিকট মাগরিবে অর্থাৎ আফ্রিকার তিউনিস ও আলজেরিয়ার পূর্বাঞ্চলের লোকদের নিকট অদ্যাবধি কোন আযান নেই মূল এক আযান ব্যতীত’।[35] হযরত আলী (রাঃ)-এর (৩৫-৪০ হিঃ) রাজধানী কূফাতেও এই আযান চালু ছিল না। [36] ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেন, উমাইয়া খলীফা হেশাম বিন আব্দুল মালেক (১০৫-২৫/৭২৪-৭৪৩ খৃঃ) সর্বপ্রথম ওছমানী আযানকে ‘যাওরা’ বাজার থেকে এনে মদীনার মসজিদে চালু করেন।[37] ইবনুল হাজ্জ মালেকী বলেন, অতঃপর হেশাম খুৎবাকালীন মূল আযানকে মসজিদের মিনার থেকে নামিয়ে ইমামের সম্মুখে নিয়ে আসলেন’।[38] ফলে বর্তমানে খুৎবার প্রায় আধা ঘণ্টা পূর্বে ‘ডাক আযান’ হচ্ছে মিনারে বা মাইকে। অতঃপর খুৎবার মূল আযান বা কথিত ‘ছানী আযান’ হচ্ছে মিম্বরের সম্মুখে বা মসজিদের দরজার বাইরে।[39]

এইভাবে হাজ্জাজী ও হেশামী আযান সর্বত্র চালু হয়েছে। অথচ জুম‘আর সুন্নাতী আযান ছিল একটি। ইবনু আব্দিল বার্র বলেন, খত্বীব মিম্বরে বসার পরে সম্মুখ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে যে আযান দেওয়া হয় (এবং যা ইসলামের স্বর্ণযুগে চালু ছিল), এটাই সঠিক। এর বাইরে মিম্বরের নিকটে খত্বীবের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আযান দেওয়া বিষয়ে একটি বর্ণও প্রমাণিত নয়’।[40] অতএব আমাদের উচিত হবে সেই হারানো সুন্নাত যেন্দা করা। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন إِنَّ مِنْ وَرَائِكُمْ زَمَانَ صَبْرٍ لِلْمُتَمَسِّكِ فِيْهِ أَجْرُ خَمْسِيْنَ شَهِيْدًا مِّنْكُمْ– ‘তোমাদের পরে এমন একটা কষ্টকর সময় আসছে, যখন সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে ধারণকারী ব্যক্তি তোমাদের মধ্যকার পঞ্চাশ জন শহীদের সমান নেকী পাবে’।[41] তাছাড়া বর্তমানে মাইক, ঘড়ি, মোবাইল ইত্যাদির যুগে ওছমানী আযানের প্রয়োজনীয়তা আছে কি-না, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়।

খুৎবা (خطبة الجمعة) :

জুম‘আর জন্য দু’টি খুৎবা দেওয়া সুন্নাত, যার মাঝখানে বসতে হয়।[42] ইমাম মিম্বরে বসার সময় মুছল্লীদের উদ্দেশ্যে সালাম দিবেন।[43] আবুবকর ও ওমর (রাঃ) এটি নিয়মিত করতেন। আবু হানীফা ও মালেক (রহঃ) প্রমুখ মসজিদে প্রবেশকালে সালাম করাকেই যথেষ্ট বলেছেন।[44] খত্বীব হাতে লাঠি নিবেন। [45] নিতান্ত কষ্টদায়ক না হ’লে সর্বদা দাঁড়িয়ে খুৎবা দিবেন। ১ম খুৎবায় হাম্দ, দরূদ ও ক্বিরাআত ছাড়াও সকলকে নছীহত করবেন, অতঃপর বসবেন। দ্বিতীয় খুৎবায় হাম্দ ও দরূদ সহ সকল মুসলমানের জন্য দো‘আ করবেন।[46] প্রয়োজনে এই সময়ও কিছু নছীহত করা যায়।[47] ইমাম শাফেঈ (রহঃ) হাম্দ, দরূদ ও নছীহত তিনটি বিষয়কে খুৎবার জন্য ‘ওয়াজিব’ বলেছেন। যাতে কুরআন থেকে একটি আয়াত হ’লেও পাঠ করতে হবে। এতদ্ব্যতীত সূরায়ে ক্বাফ-এর প্রথমাংশ বা অন্য কিছু আয়াত তেলাওয়াত করা মুস্তাহাব।[48] খুৎবা আখেরাত মুখী, সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ হওয়া বাঞ্ছনীয়। [49] তবে দীর্ঘ হওয়াও জায়েয আছে।[50] খুৎবার সময় কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সংক্ষিপ্তভাবে দু’রাক‘আত ‘তাহিইয়াতুল মাসজিদ’ ছালাত পড়ে বসবেন’।[51]

মাতৃভাষায় খুৎবা দান (خطبة الجمعة باللغة الأهلية) :

খুৎবা মাতৃভাষায় এবং অধিকাংশ মুছল্লীদের বোধগম্য ভাষায় হওয়া যরূরী। কেননা খুৎবা অর্থ ভাষণ, যা শ্রোতাদের বোধগম্য ভাষায় হওয়াই স্বাভাবিক। আল্লাহ বলেন, وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُوْلٍ إِلاَّ بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ ‘আমরা সকল রাসূলকেই তাদের স্বজাতির ভাষা-ভাষী করে প্রেরণ করেছি, যাতে তিনি তাদেরকে (আল্লাহর দ্বীন) ব্যাখ্যা করে দেন’ (ইবরাহীম ১৪/৪)। অতঃপর আমাদের রাসূল (ছাঃ)-কে খাছ করে বলা হচ্ছে, وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُوْنَ– ‘আর আমরা আপনার নিকটে ‘যিকর’ (কুরআন) নাযিল করেছি, যাতে আপনি লোকদের নিকট ঐসব বিষয়ে ব্যাখ্যা করে দেন, যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে। যাতে তারা চিন্তা-গবেষণা করে’ (নাহ্ল ১৬/৪৪)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সময়ের চাহিদা অনুযায়ী খুৎবা দিতেন। নবী আর আসবেন না। তাই রাসূলের ‘ওয়ারিছ’ হিসাবে[52] প্রত্যেক আলেম ও খত্বীবের উচিত মুছল্লীদের নিজস্ব ভাষায় কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বিধান সমূহ খুৎবায় ব্যাখ্যা করে শুনানো। নইলে খুৎবার উদ্দেশ্য বিনষ্ট হবে।

হযরত জাবের বিন সামুরাহ (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে এসেছে যে, খুৎবার সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দু’চোখ উত্তেজনায় লাল হয়ে যেত। গলার স্বর উঁচু হ’ত ও ক্রোধ ভীষণ হ’ত। যেন তিনি কোন সৈন্যদলকে হুঁশিয়ার করছেন’।[53] ছাহেবে মির‘আত বলেন, ‘অবস্থা অনুযায়ী এবং মুছল্লীদের বোধগম্য ভাষায় খুৎবা দেওয়ার ব্যাপারে জাবের বিন সামুরাহ (রাঃ) বর্ণিত অত্র হাদীছটিই হ’ল প্রথম দলীল’।[54] মনে রাখা আবশ্যক যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মাতৃভাষায় খুৎবা দিতেন। তাঁর ও তাঁর ছাহাবীগণের মাতৃভাষা ছিল আরবী। তিনি ছিলেন বিশ্বনবী। তাই বিশ্বের সকল ভাষাভাষী তাঁর উম্মতকে স্ব স্ব মাতৃভাষায় খুৎবা দানের মাধ্যমে কুরআন ও হাদীছ ব্যাখ্যা করে দিতে হবে, যা অবশ্য পালনীয়।

যদি বলা হয় যে, রাসূল (ছাঃ) আরবী ভাষায় খুৎবা দিতেন, অতএব আমাদেরও কেবল আরবীতে খুৎবা দিতে হবে, তাহ’লে তো বলা হবে যে, তিনি যেহেতু সর্বক্ষণ আরবী ভাষায় কথা বলতেন, অতএব আমাদেরকেও মাতৃভাষা ছেড়ে সর্বক্ষণ আরবীতে কথা বলতে হবে। আরবী ব্যতীত অন্য ভাষা বলা যদি নিষিদ্ধ হয়, তাহ’লে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) যায়েদ বিন ছাবিত (রাঃ)-কে ইহুদীদের হিব্রু ভাষা শিখতে বললেন কেন? যা তিনি ১৫ দিনেই শিখে ফেলেন ও উক্ত ভাষায় রাসূল (ছাঃ)-এর পক্ষে পত্র পঠন, লিখন ও দোভাষীর কাজ করেন। [55]

নওয়াব ছিদ্দীক হাসান খান ভূপালী (রহঃ) বলেন, শ্রোতামন্ডলীকে জান্নাতের প্রতি উৎসাহ দান ও জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করাই ছিল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর খুৎবার নিয়মিত উদ্দেশ্য। এটাই হ’ল খুৎবার প্রকৃত রূহ এবং এজন্যই খুৎবার প্রচলন হয়েছে’।[56]

বিভিন্ন মসজিদে স্রেফ আরবী খুৎবা পাঠের যে প্রচলন রয়েছে, তা নিঃসন্দেহে খুৎবার উদ্দেশ্য বিরোধী। এটা বুঝতে পেরে বর্তমানে মূল খুৎবার পূর্বে মিম্বরে বসে মাতৃভাষায় বক্তব্য রাখার মাধ্যমে যে তৃতীয় আরেকটি খুৎবা চালু করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বিদ‘আত। কেননা জুম‘আর জন্য নির্ধারিত খুৎবা হ’ল দু’টি, তিনটি নয়। তাছাড়া মূল খুৎবার পূর্বের সময়টি মুছল্লীদের নফল ছালাতের সময়। তাদের ছালাতের সুযোগ নষ্ট করে বক্তৃতা করার অধিকার ইসলাম কোন খত্বীব ছাহেবকে দেয়নি। অতএব সুন্নাতের উপরে আমল করতে চাইলে মূল খুৎবায় দাঁড়িয়ে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে মুছল্লীদের উদ্দেশ্যে তাদের বোধগম্য ভাষায় নছীহত করতে হবে। খুৎবার সময় কথা বলা নিষেধ। এমনকি অন্যকে ‘চুপ কর’ একথাও বলা চলবে না।[57]

ক্বিরাআত : জুম‘আর ছালাতে ইমাম প্রথম রাক‘আতে সূরায়ে ‘জুম‘আ’ অথবা সূরায়ে ‘আ‘লা’ এবং দ্বিতীয় রাক‘আতে সূরায়ে ‘মুনা-ফিকূন’ অথবা সূরায়ে ‘গা-শিয়াহ’ পড়বেন। [58] অন্য সূরাও পড়া যাবে।[59] জুম‘আর দিন ফজরের ১ম রাক‘আতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সূরায়ে ‘সাজদাহ’ ও ২য় রাক‘আতে সূরায়ে ‘দাহর’ পাঠ করতেন।[60]

দো‘আ চাওয়া : মুছল্লীদের নিকটে বিশেষ কোন দো‘আ চাওয়ার থাকলে খত্বীব বা ইমামের মাধ্যমে পূর্বেই সকলকে অবহিত করা উচিত। যাতে সবাই উক্ত মুছল্লীর প্রার্থনা অনুযায়ী আল্লাহর নিকটে দো‘আ করতে পারে ও নিজেদের দো‘আর নিয়তের মধ্যে তাকেও শামিল করতে পারে। কেননা সালাম ফিরানোর মাধ্যমে ছালাত শেষ হয়ে যায়। আর ছালাতের মধ্যেই দো‘আ কবুল হয়। বিশেষ করে সিজদার হালতে। কিন্তু সালাম ফিরানোর পর ইমাম ও মুক্তাদী সম্মিলিতভাবে দো‘আ ও ‘আমীন’ ‘আমীন’ বলার প্রচলিত প্রথাটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাতের পরিপন্থী।

দো‘আ কবুলের সময়কাল : বিদ্বানগণ জুম‘আর দিনে দো‘আ কবুলের সঠিক সময়কাল নিয়ে মতভেদ করেছেন। এই মতভেদের ভিত্তি মূলতঃ আমর বিন আওফ (রাঃ) বর্ণিত তিরমিযীর হাদীছ, যেখানে ‘জামা‘আতের শুরু থেকে সালাম ফিরানো পর্যন্ত’ সময়কালকে এবং অপরটি আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) বর্ণিত হাদীছ, যেখানে ঐ সময়কালকে ‘আছরের ছালাতের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত’ বলা হয়েছে।[61] এবিষয়ে বিদ্বানগণের ৪৩টি মতভেদ উল্লেখিত হয়েছে। [62]

তিরমিযীর ভাষ্যকার আহমাদ মুহাম্মাদ শাকির (রহঃ) বলেন, শেষোক্ত হাদীছের রাবী আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) এখানে রাসূল (ছাঃ)-এর বক্তব্য وَهُوَ يُصَلِّيْ (ছালাতের অবস্থা)- কে يَنْتَظِرُ الصَّلاَةَ (ছালাতের অপেক্ষারত) বলে ব্যাখ্যা করেছেন।[63] এতেই বুঝা যায় যে, তিনি এটা সরাসরি রাসূল (ছাঃ) থেকে শুনেছেন বলে বর্ণনা করেননি। পক্ষান্তরে আমর বিন আওফ (রাঃ) বর্ণিত তিরমিযী ও ইবনু মাজাহর হাদীছটি মরফূ, যা ইমাম বুখারী ও তিরমিযী ‘হাসান’ বলেছেন, সেটি রাসূল (ছাঃ)-এর বক্তব্য وَهُوَ يُصَلِّيْ (ছালাতরত অবস্থা)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল। আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ) হ’তে ছহীহ মুসলিমে বর্ণিত অপর একটি হাদীছ একে শক্তিশালী করে। যেখানে এই সময়কালকে هِيَ مَا بَيْنَ أَنْ يَّجْلِسَ الْإِمَامُ إِلَى أَنْ تُقْضَى الصَّلاَةُ ‘খত্বীব মিম্বরে বসা হ’তে ছালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত’ বলা হয়েছে।[64] ইবনুল ‘আরাবী বলেন, এই বক্তব্যটিই অধিকতর সঠিক। কেননা এ সময়ের সম্পূর্ণটাই ছালাতের অবস্থা। এতে হাদীছে বর্ণিত ‘ছালাতরত অবস্থায়’ বক্তব্যের সাথে শব্দগত ও অর্থগত উভয় দিক দিয়ে মিল হয়’। বায়হাক্বী, ইবনুল ‘আরাবী, কুরতুবী, নববী প্রমুখ এ বক্তব্য সর্মথন করেন।[65] অতএব ‘খতীব মিম্বরে বসা হ’তে সালাম ফিরানো পর্যন্ত ছালাতরত অবস্থায়’ দো‘আ কবুলের মতটিই ছহীহ হাদীছের অধিকতর নিকটবর্তী।

ঘুমের প্রতিকার : দো‘আ কবুলের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনেক মুছল্লী বিশেষ করে খুৎবার সময় ঘুমে ঢুলতে থাকে। ফলে তারা খুৎবার কিছুই উপলব্ধি করতে পারেনা। এজন্য এর প্রতিকার হিসাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, তোমাদের কেউ যখন খুৎবার সময় ঘুমে ঢুলতে থাকে, তখন সে যেন তার অবস্থান পরিবর্তন করে’। [66] এ বিষয়ে মুছল্লীদের পরস্পরকে সাহায্য করা উচিত।

এহ্তিয়াত্বী জুম‘আ (صلاة الظهر بعد الجمعة احتياطاً) :

এহ্তিয়াত্বী জুম‘আ বা ‘আখেরী যোহর’ নামে জুম‘আর ছালাতের পরে পুনরায় যোহরের চার রাক‘আত একই ওয়াক্তে পড়ার যে রেওয়াজ এদেশে চালু আছে, তা নিঃসন্দেহে বিদ‘আত। কেননা জুম‘আর পরে যোহর পড়ার কোন দলীল নেই। তাছাড়া যে ব্যক্তি জুম‘আ পড়ে, তার উপর থেকে যোহরের ফরযিয়াত উঠে যায়। কারণ জুম‘আ হ’ল যোহরের স্থলাভিষিক্ত। এক্ষণে যে ব্যক্তি জুম‘আ আদায়ের পর যোহর পড়ে, তার পক্ষে কুরআন, সুন্নাহ এবং কোন বিদ্বানের সমর্থন নেই।[67] গ্রামে জুম‘আ হবে কি হবে না, এই সন্দেহে পড়ে কিছু লোক দু’টিই পড়ে থাকে।

কোন কোন দেশে জুম‘আর ছালাতের পরপরই পুনরায় যোহরের জামা‘আত দাঁড়িয়ে যায়। ভাবখানা এই যে, জুম‘আ কবুল না হ’লে যোহর তো নিশ্চিত। আর যদি জুম‘আ কবুল হয়, তাহ’লে যোহরটা নফল হবে ও বাড়তি নেকী পাওয়া যাবে। অথচ সন্দেহের ইবাদতে কোন নেকী হয় না। বরং স্থির সংকল্প বা নিয়ত হ’ল নেকী পাওয়ার আবশ্যিক পূর্বশর্ত। [68] এই সন্দেহযুক্ত ছালাত এখুনি পরিত্যাজ্য।[69] নইলে বিদ‘আতী আমলের কারণে গোনাহগার হ’তে হবে।

আববাসীয় খলীফাদের আমলে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ভ্রান্ত ফের্কা মু‘তাযিলাগণ এটি চালু করে। যা পরবর্তীকালের কিছু হানাফী আলেমের মাধ্যমে সুন্নীদের অনেকের মধ্যে চালু হয়ে যায়। অথচ জুম‘আ আল্লাহ ফরয করেছেন। আর কোন ফরযে সন্দেহ করা কুফরীর শামিল। অতএব যারা জেনে বুঝে আখেরী যোহরে অভ্যস্ত, তাদের এখুনি তওবা করা উচিত ও কেবলমাত্র জুম‘আ আদায় করা কর্তব্য। খোদ হানাফী মাযহাবেও ‘আখেরী যোহর’ না পড়াকে ‘উত্তম’ বলা হয়েছে।[70]

জুম‘আর সুন্নাত (سنن الجمعة) : জুম‘আর পূর্বে নির্দিষ্ট কোন সুনণাত ছালাত নেই। মুছল্লী কেবল ‘তাহিইয়াতুল মাসজিদ’ দু’রাক‘আত পড়ে বসবে। অতঃপর সময় পেলে খত্বীব মিম্বরে বসার আগ পর্যন্ত যত খুশী নফল ছালাত আদায় করবে। জুম‘আর ছালাতের পরে মসজিদে চার রাক‘আত অথবা বাড়ীতে দু’রাক‘আত সুন্নাত আদায় করবে। তবে মসজিদেও চার বা দুই কিংবা দুই ও চার মোট ছয় রাক‘আত সুন্নাত ও নফল পড়া যায়।[71] ইবনু ওমর (রাঃ) চার রাক‘আত সুন্নাত এক সালামে পড়তেন। তবে দুই সালামেও পড়া যায়।[72] জুম‘আর (খুৎবার) পূর্বে এক সালামে চার রাক‘আত পড়ার হাদীছটি ‘যঈফ’। [73]

জুম‘আ বিষয়ে অন্যান্য জ্ঞাতব্য (معلومات أخرى فى الجمعة) :

(১) বাধ্যগত কারণে জুম‘আ পড়তে অপারগ হ’লে যোহর পড়বে।[74] সফরে থাকলে ক্বছর করবে। মুসাফির একাধিক হ’লে জামা‘আতের সাথে ক্বছর পড়বে।[75]
(২) জুম‘আর ছালাত ইমামের সাথে এক রাক‘আত পেলে বাকী আরেক রাক‘আত যোগ করে পূরা পড়ে নিবে।[76]
(৩) কিন্তু রুকূ না পেলে এবং শেষ বৈঠকে যোগ দিলে চার রাক‘আত পড়বে’।[77] অর্থাৎ জুম‘আর নিয়তে ছালাতে যোগদান করবে এবং যোহর হিসাবে শেষ করবে।[78] ‘এর মাধ্যমে সে জামা‘আতে যোগদানের পূরা নেকী পাবে’। [79] অবশ্য রুকূ পাওয়ার সাথে সাথে তাকে ক্বিয়াম ও ক্বিরাআতে ফাতিহা পেতে হবে। কেননা ‘সূরা ফাতিহা ব্যতীত ছালাত সিদ্ধ হয় না’।[80] উল্লেখ্য যে, ‘যে ব্যক্তি তাশাহহুদ পেল, সে ব্যক্তি ছালাত পেল’ মর্মে মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ-তে ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বর্ণিত আছারটি যঈফ।[81]
(৪) খত্বীব মিম্বরে বসার পর মুছল্লীগণ দ্রুত কাছাকাছি চলে আসবে ও খত্বীবের মুখোমুখি হয়ে বসবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত দূরে বসবে, সে ব্যক্তি জান্নাতে গেলেও দেরীতে প্রবেশ করবে।[82]
(৫) খুৎবার সময় মুছল্লীদের তিনমাথা হয়ে (الْحَبْوَة) অর্থাৎ দু’পা উঁচু করে দু’হাটুতে মাথা রেখে বসা নিষেধ।[83]
(৬) পিছনে এসে সামনের মুছল্লীদের ডিঙিয়ে যাওয়া উচিত নয়। বরং সেখানেই বসে পড়বে।[84]
(৭) জুম‘আ সহ কোন বৈঠকেই কাউকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে বসতে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) নিষেধ করেছেন।[85] তবে সকলকে বলবে, إِفْسَحُوْا ‘আপনারা জায়গা ছেড়ে দিন’।[86]
(৮) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, জুম‘আতে তিন ধরনের লোক আসে। 
(ক) যে ব্যক্তি অনর্থক আসে, সে তাই পায় 
(খ) যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনার জন্য আসে। আল্লাহ চাইলে তাকে দেন, অথবা না দেন 
(গ) যে ব্যক্তি নীরবে আসে এবং কারু ঘাড় মটকায় না ও কষ্ট দেয় না, তার জন্য এই জুম‘আ তার পরবর্তী জুম‘আ এমনকি তার পরের তিনদিনের (ছগীরা) গোনাহ সমূহের কাফফারা হয়ে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একটি নেকীর কাজ করে, তার জন্য দশগুণ প্রতিদান রয়েছে’ (আন‘আম ৬/১৬০)।[87]


[1] . মির‘আত ২/২৮৮; ঐ, ৪/৪৫১; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ২/২১১।
[2] . ইবনু মাজাহ হা/১০৮২; সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৪৯৪; যা-দুল মা‘আ-দ ১/৯৮।
[3] . ইবনু মাজাহ হা/১০৮২; আবুদাঊদ হা/১০৬৯ সনদ ‘হাসান’। সীরাতে ইবনে হিশাম ১/৪৩৫; যা-দুল মা‘আ-দ ১/৩৬১; নায়ল ৪/১৫৭-৫৮; মির‘আত ৪/৪২০। ১১ নববী বর্ষের হজ্জের মওসুমে (জুলাই ৬২০ খৃ:) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাতে সর্বপ্রথম বায়‘আতকারী ৬ জন যুবকের কনিষ্ঠতম নেতা, যার নেতৃত্বে মদীনায় সর্বপ্রথম ইসলাম প্রচারিত হয় এবং পরবর্তী দু’বছরে ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী মক্কায় এসে বায়‘আত গ্রহণ করেন। অতঃপর ১৪শ নববী বর্ষের রবীউল আউয়াল মাসে (সেপ্টেম্বর ৬২২) হিজরত সংঘটিত হয় এবং ১ম হিজরী সনেই শাওয়াল মাসে অল্প বয়সে তাঁর মৃত্যু হয় ও বাক্বী‘ গোরস্থানে ১ম ছাহাবী হিসাবে কবরস্থ হন =আল-ইছাবাহ, ক্রমিক সংখ্যা ১১১।
[4] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৫৪ ‘জুম‘আ’ অনুচ্ছেদ-৪২; মির‘আত ৪/৪২১ পৃঃ ।
[5] . মির‘আত ৪/৪১৯-২১ পৃঃ; ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা আ‘রাফ ৫৪।
[6] . ইবনু মাজাহ হা/১০৮২ ‘ছালাতে দাঁড়ানো’ অধ্যায়-৫, ‘জুম‘আ ফরয হওয়া’ অনুচ্ছেদ-৭৮; আবুদাঊদ হা/১০৬৯ ‘ছালাত’ অধ্যায়-২, ‘গ্রামে জুম‘আ’ অনুচ্ছেদ-২১৬।
[7] . জুম‘আ ৬২/৯; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২২৫।
[8] . আবুদাঊদ, দারাকুৎনী, মিশকাত হা/১৩৭৭, ১৩৮০ ‘জুম‘আ ওয়াজিব হওয়া’ অনুচ্ছেদ-৪৩; ইরওয়া হা/৫৯২, ৩/৫৪, ৫৮; আর-রওযাতুন নাদিইয়াহ ১/৩৪১ পৃঃ।
[9] . মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/৫১০৮; ইরওয়া ৩/৬৬, হা/৫৯৯-এর শেষে; ফাৎহুল বারী হা/৮৯২-এর আলোচনা দ্র: ২/৪৪১, ‘জুম‘আ’ অধ্যায়-১১, অনুচ্ছেদ-১১।
[10] . নায়লুল আওত্বার ৪/১৫৯-৬১; মির‘আত ২/২৮৮-৮৯; ঐ, ৪/৪৪৯-৫০।
[11] . ছিদ্দীক্ব হাসান খান ভূপালী, আর-রওযাতুন নাদিইয়াহ ১/৩৪২ পৃঃ।
[12] . মুওয়াত্ত্বা, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৩৯৮ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘পরিচ্ছন্নতা অর্জন ও সকাল সকাল মসজিদে গমন’ অনুচ্ছেদ-৪৪।
[13] . বুখারী, মিশকাত হা/১৩৮১, অনুচ্ছেদ-৪৪।
[14] . নাসাঈ হা/৬৬১; আহমাদ, মিশকাত হা/১১০৪; ছহীহুল জামে‘ হা/১৮৩৯, ৪২।
[15] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৭০৪ ‘মসজিদ ও ছালাতের স্থানসমূহ’ অনুচ্ছেদ-৭।
[16] . মুসলিম, মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৩৫৮, ১৩৮৪, ৮৭।
[17] . বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৩৮১-৮২; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৩৬।
[18] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৪১১ ‘খুৎবা ও ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৫; আবুদাঊদ হা/১১১৬।
[19] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৩৭৮ ‘জুম‘আ ওয়াজিব হওয়া’ অনুচ্ছেদ-৪৩।
[20] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৩৭০, অনুচ্ছেদ-৪৩।
[21] . আবু ইয়া‘লা, ছহীহ আত-তারগীব হা/৭৩৩; আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১৩৭১।
[22] . ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১৮৫৭; ছহীহ আত-তারগীব হা/৭২৬-২৮; মির‘আত ৪/৪৪৬।
[23] . ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৩৬৩ ‘জুম‘আ’ অনুচ্ছেদ-৪২।
[24] . আহমাদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১৩৬৭ ‘জুম‘আ’ অনুচ্ছেদ-৪২।
[25] . আবুদাঊদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৩৬১, ১৩৬৩।
[26] . মুসলিম, আবুদাঊদ, মুওয়াত্ত্বা, মিশকাত হা/১৩৫৬-৫৯ ও ১৩৬১ ‘জুম‘আ’ অনুচ্ছেদ-৪২; তিরমিযী হা/৪৯০-৯১, শরহ আহমাদ মুহাম্মাদ শাকির (বৈরূত ছাপা ১৪০৮/১৯৮৭) ২/৩৬১ ও ৩৬৩-৬৪ পৃঃ।
[27] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৩৫৭, ‘জুম‘আ অনুচ্ছেদ-৪২।
[28] . তিরমিযী হা/৪৮৯; মিশকাত হা/১৩৬০, ‘জুম‘আ’ অনুচ্ছেদ-৪২।
[29] . ইবনুল ক্বাইয়িম, যা-দুল মা‘আদ ১/৩৮৬।
[30] . মুসলিম, মিশকাত হা/৮৯৪ ‘সিজদা ও তার ফযীলত’ অনুচ্ছেদ-১৪; ঐ, হা/৮১৩ ‘তাকবীরের পর যা পড়তে হয়’ অনুচ্ছেদ-১১; মুসলিম, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৪২৪/১৭, (বৈরূত ছাপা ১৪০৯/১৯৮৯) পৃঃ ৫৩৭।
[31] . বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৩৮১-৮২, পরিচ্ছন্নতা অর্জন ও সকাল সকাল মসজিদে যাওয়া, অনুচ্ছেদ-৪৪।
[32] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৮৪, অনুচ্ছেদ-৪৪।
[33] . তিরমিযী, আবুদাঊদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৩৮৮; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৩৬; মির‘আত ৪/৪৭১।
[34] . বুখারী, মিশকাত হা/১৪০৪ ‘খুৎবা ও ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৫; ফাৎহ ২/৪৫৮। ‘যাওরা বাজার’ বর্তমানে মসজিদে নববীর আঙিনার অন্তর্ভুক্ত।
[35] . মির‘আত ২/৩০৭; ঐ, ৪/৪৯২। উল্লেখ্য যে, যিয়াদ বিন আবীহি ছিলেন মু‘আবিয়া (৪১-৬০/৬৬১-৬৮০ খৃঃ)-এর আমলে বছরার গভর্ণর। অন্যদিকে উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ানের আমলে (৬৫-৮৬/৬৮৫-৭০৫ খৃঃ) তার সেনাপতি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের হাতে হেজায, ইরাক, মিসর ও সিরিয়ার কিছু অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ খলীফা (৬৪-৭৩ হিঃ) আব্দুল্লাহ ইবনু যুবায়ের (১-৭৩ হিঃ) মক্কায় শহীদ হ’লে হাজ্জাজ (৪০-৯৫/৬৬০-৭১৪ খৃঃ) মক্কার শাসক নিযুক্ত হন।
[36] . তাফসীরে জালালায়েন, ৪৬০ পৃঃ, টীকা ১৯; কুরতুবী ১৮/১০০ পৃঃ, তাফসীর সূরা জুম‘আ, ৯ আয়াত।
[37] . মির‘ক্বাত শরহ মিশকাত (দিল্লী ছাপা : তাবি) ৩/২৬৩।
[38] . ‘আওনুল মা‘বূদ শরহ আবুদাঊদ (কায়রো : ১৪০৭/১৯৮৭) ৩/৪৩৩-৩৪ পৃঃ, হা/১০৭৪-৭৫-এর ব্যাখ্যা দ্রঃ।
[39] . ‘মিম্বরের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আযান দেওয়ার রেওয়াজ রাসূলের যামানা থেকে নিয়মিতভাবে (بذلك جرى التوارث) চলে আসছে’ বলে প্রসিদ্ধ হানাফী ফিক্বহ গ্রন্থ ‘হেদায়া’-র লেখক যে দাবী করেছেন, তা একেবারেই বাতিল ও ভিত্তিহীন। দ্রঃ ‘আওনুল মা‘বূদ হা/১০৭৫-এর আলোচনা, ৩/৪৩৪-৩৭।
[40] . ولم يثبت حرف واحد فى الأذان مستقبل الإمام محاذيًا به عند المنبر ‘আওনুল মা‘বূদ ৩/৪৩৭, হা/১০৭৫-এর ব্যাখ্যা, ‘জুম‘আর দিনে আহবান’ অনুচ্ছেদ-২২২।
[41] . ত্বাবারাণী কাবীর হা/১০২৪০; ছহীহুল জামে‘ হা/২২৩৪।
[42] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০৫; আর-রওযাতুন নাদিইয়াহ ১/৩৪৫।
[43] . ইবনু মাজাহ হা/১১০৯; ছহীহাহ হা/২০৭৬।
[44] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৩০; নায়ল ৪/২০১।
[45] . আবুদাঊদ হা/১০৯৬; ইরওয়া হা/৬১৬, ৩/৭৮, ৯৯; নায়ল ৪/২১২।
[46] . জুম‘আ ৬২/১১; মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০৫, ১৫, ১৬ ‘খুৎবা ও ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৫; নাসাঈ হা/১৪১৮, ‘২য় খুৎবায় ক্বিরাআত ও যিকর’ অনুচ্ছেদ-৩৫; আহমাদ, ত্বাবারাণী, ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৩৪; মির‘আত ২/৩০৮; ঐ, ৪/৪৯৪, ৫০৮-০৯।
[47] . নাসাঈ হা/১৪১৭-১৮, তিরমিযী হা/৫০৬, ‘জুম‘আ’ অধ্যায়-৪, অনুচ্ছেদ-১১।
[48] . মির‘আত ২/৩০৮, ৩১০; ঐ, ৪/৪৯৪, ৪৯৮-৯৯; মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০৯, অনুচ্ছেদ-৪৫।
[49] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০৫-০৬ ‘খুৎবা ও ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৫।
[50] . মুসলিম হা/৭২৬৭ (২৮৯২), ‘ফিতান’ অধ্যায়-৫২, অনুচ্ছেদ-৬; মির‘আত ৪/৪৯৬।
[51] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৪১১; ‘খুৎবা ও ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৫; নায়ল ৪/১৯৩।
[52] . তিরমিযী, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/২১২ ‘ইলম’ অধ্যায়-২।
[53] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০৭; মির‘আত ২/৩০৯; ঐ, ৪/৪৯৬-৯৭।
[54] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০৫; মির‘আত হা/১৪১৮-এর আলোচনা দ্রঃ, ৪/৪৯৪-৯৫।
[55] . তিরমিযী, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৪৬৫৯ ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়-২৫, ‘সালাম’ অনুচ্ছেদ-১।
[56] . নওয়াব ছিদ্দীক হাসান খান ভূপালী, আর-রওযাতুন নাদিইয়াহ ১/৩৪৫।
[57] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৮৫ ‘পরিচ্ছন্নতা অর্জন ও সকাল সকাল মসজিদে গমন’ অনুচ্ছেদ-৪৪।
[58] . মুসলিম, মিশকাত হা/৮৩৯-৪০ ‘ছালাতে ক্বিরাআত’ অনুচ্ছেদ-১২।
[59] . আবুদাঊদ হা/৮১৮, ৮২০, ৮৫৯।
[60] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৮৩৮।
[61] . তিরমিযী হা/৪৮৯; ঐ, মিশকাত হা/১৩৬০; তুহফা হা/৪৮৮-৮৯।
[62] . শাওকানী, নায়লুল আওত্বার ৪/১৭২-৭৬।
[63] . তিরমিযী হা/৪৯১; আবুদাঊদ হা/১০৪৬; মুওয়াত্ত্বা, নাসাঈ, মিশকাত হা/১৩৫৯ ‘জুম‘আ’ অনুচ্ছেদ-৪২।
[64] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৩৫৮, ‘জুম‘আ’ অনুচ্ছেদ-৪২।
[65] . আহমাদ মুহাম্মাদ শাকির, শরহ তিরমিযী ২/৩৬৩-৬৪, হা/৪৯০-৯১।
[66] . তিরমিযী, মিশকাত হা/১৩৯৪ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, অনুচ্ছেদ-৪৪।
[67] . সাইয়িদ সাবিক্ব, ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২২৭।
[68] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মুক্বাদ্দামা মিশকাত হা/১।
[69] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, আহমাদ প্রভৃতি, মিশকাত হা/২৭৬২, ২৭৭৩ ‘ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায়-১১।
[70] . দ্রঃ দুর্রে মুখতার ১/৩৬৭; হাক্বীক্বাতুল ফিক্বহ (বোম্বাই : তাবি; সংশোধনে : দাঊদ রায), ২৫৩ পৃঃ; ফাতাওয়া নাযীরিয়াহ (দিল্লী : ১৪০৯/১৯৮৮), ১/৫৭৫-৮০।
[71] . মুসলিম, মিশকাত হা/১১৬৬ ‘সুন্নাত ছালাত সমূহ ও তার ফযীলত’ অনুচ্ছেদ-৩০; তিরমিযী হা/৫২২-২৩ ‘জুম‘আ’ অধ্যায়-৪, অনুচ্ছেদ-২৪; মির‘আত ২/১৪৮; ঐ, ৪/১৪২-৪৩।
[72] . মির‘আত ৪/২৫৭-৫৮।
[73] . ইবনু মাজাহ হা/১১২৯ ‘ছালাত’ অধ্যায়-২, ‘জুম‘আর পূর্বে ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৯৪।
[74] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২২৬-২৭।
[75] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২২৬; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৩৪, ‘সফরে ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪১।
[76] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৪১২, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘খুৎবা ও ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৫।
[77] . মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ, বায়হাক্বী ৩/২০৪; ত্বাবারাণী কাবীর, সনদ ছহীহ; ইরওয়া ৩/৮২।
[78] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৩৫, টীকা দ্র:।
[79] . বায়হাক্বী, ইরওয়া হা/৬২১; ৩/৮১-৮২।
[80] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৮২২; আলোচনা দ্রষ্টব্য : ‘সূরা ফাতিহা পাঠ’ অধ্যায়।
[81] . আলবানী, ইরওয়াউল গালীল ৩/৮২।
[82] . আবুদাঊদ হা/১১০৮; ঐ, মিশকাত হা/১৩৯১, অনুচ্ছেদ-৪৪; তিরমিযী, মিশকাত হা/১৪১৪, অনুচ্ছেদ-৪৫।
[83] . তিরমিযী, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৩৯৩ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, অনুচ্ছেদ-৪৪।
[84] . আবুদাঊদ হা/১১১৮ ‘ছালাত’ অধ্যায়-২, অনুচ্ছেদ-২৩৮।
[85] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৯৫ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, অনুচ্ছেদ-৪৪।
[86] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৩৮৬ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, অনুচ্ছেদ-৪৪।
[87] . আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৩৯৬, অনুচ্ছেদ-৪৪।


৫. ঈদায়নের ছালাত (صلاة العيدين)


সূচনা : ঈদায়নের ছালাত ২য় হিজরী সনে চালু হয়।[1] ঈদায়েন হ’ল মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ নির্ধারিত বার্ষিক দু’টি আনন্দ উৎসবের দিন। ঈদায়নের উৎসব হবে পবিত্রতাময় ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ। প্রাক ইসলামী যুগে আরব দেশে অন্যদের অনুকরণে নববর্ষ ও অন্যান্য উৎসব পালনের রেওয়াজ ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় হিজরত করার পরে দেখলেন যে, মদীনাবাসীগণ বছরে দু’দিন খেলাধূলা ও আনন্দ-উৎসব করে। তখন তিনি তাদেরকে বললেন,

قَدْ أَبْدَلَكُمُ اللهُ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهَا، يَوْمُ الْأَضْحَى وَيَوْمُ الْفِطْرِ، متفق عليه-

‘আল্লাহ তোমাদের ঐ দু’দিনের বদলে দু’টি মহান উৎসবের দিন প্রদান করেছেন ‘ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর’।[2] দুই ঈদের দিন এবং ঈদুল আযহার পরের তিন দিন ছিয়াম পালন নিষিদ্ধ।[3]

গুরুত্ব : ঈদায়নের ছালাত সুন্নাতে মুওয়াক্কাদাহ। এটি ইসলামের প্রকাশ্য ও সেরা নিদর্শন সমূহের অন্যতম। সূর্যোদয়ের পরে সকাল সকাল খোলা ময়দানে গিয়ে ঈদায়নের ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করতে হয়। কেবলমাত্র মাসজিদুল হারামে ঈদায়নের ছালাত সিদ্ধ রাখা হয়েছে বিশালায়তন হওয়ার কারণে এবং মক্কার পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের সংকীর্ণতার কারণে।[4] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় মসজিদে নববী-র বাইরে খোলা ময়দানে নিয়মিতভাবে ঈদায়নের ছালাত আদায় করেছেন এবং নারী-পুরুষ সকল মুসলমানকে ঈদায়নের জামা‘আতে শরীক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।[5]

নিয়মাবলী : ঈদায়নের ছালাতে আযান বা এক্বামত নেই। সকলকে নিয়ে ইমাম প্রথমে জামা‘আতের সাথে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবেন ও পরে খুৎবা দিবেন। খুৎবার সময় হাতে লাঠি রাখবেন। [6] একটি খুৎবা দেওয়াই ছহীহ হাদীছ সম্মত। দুই খুৎবা সম্পর্কে কয়েকটি ‘যঈফ’ হাদীছ রয়েছে। ইমাম নবভী (রহঃ) বলেন, প্রচলিত দুই খুৎবার নিয়মটি মূলতঃ জুম‘আর দুই খুৎবার উপরে ক্বিয়াস করেই চালু হয়েছে। খুৎবা শেষে বসে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করার রেওয়াজটিও হাদীছ সম্মত নয়। বরং এটাই প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঈদায়নের ছালাত শেষে দাঁড়িয়ে কেবলমাত্র একটি খুৎবা দিয়েছেন। যার মধ্যে আদেশ, নিষেধ, উপদেশ, দো‘আ সবই ছিল। [7]

ঈদায়নের জামা‘আতে পুরুষদের পিছনে পর্দার মধ্যে মহিলাগণ প্রত্যেকে বড় চাদরে আবৃত হয়ে যোগদান করবেন। প্রয়োজনে একজনের চাদরে দু’জন আসবেন। খত্বীব ছাহেব নারী-পুরুষ সকলকে উদ্দেশ্য করে তাদের বোধগম্য ভাষায় কুরআন-হাদীছের ব্যাখ্যাসহ খুৎবা দিবেন। ঋতুবতী মহিলাগণ কেবল খুৎবা শ্রবণ করবেন ও দো‘আয় শরীক হবেন। ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী বলেন যে, ‘উক্ত হাদীছের শেষে বর্ণিত دَعْوَةُ الْمُسْلِمِيْنَ কথাটি ‘আম’। এর দ্বারা ইমামের খুৎবা, নছীহত ও দো‘আ বুঝানো হয়েছে। কেননা ঈদায়নের ছালাতের পরে ইমাম ও মুক্তাদী সম্মিলিত দো‘আর প্রমাণে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে কোন ছহীহ হাদীছ বা ছাহাবায়ে কেরাম থেকে কোন আমল বর্ণিত হয়নি’। [8]

জ্ঞাতব্য : (১) বৃষ্টি কিংবা ভীতির কারণে ময়দানে যাওয়া অসম্ভব বিবেচিত হ’লে মসজিদে ঈদের জামা‘আত করা যাবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মসজিদে নববীর পূর্ব দরজার বাইরে ৫০০ গজ দূরে ‘বাত্বহান’ (بَطْحَان) প্রান্তরে ঈদায়নের ছালাত আদায় করতেন এবং একবার মাত্র বৃষ্টির কারণে মসজিদে ছালাত আদায় করেছিলেন। [9] কিন্তু বিনা কারণে বড় মসজিদের দোহাই দিয়ে ময়দান ছেড়ে মসজিদে ঈদের জামা‘আত করা সুন্নাত বিরোধী কাজ। (২) জামা‘আত ছুটে গেলে একাকী বা জামা‘আত সহকারে ঈদের ন্যায় তাকবীর সহ দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে নিবে।[10] (৩) ঈদগাহে আসতে না পারলে বাড়ীতে মেয়েরা সহ সকলকে নিয়ে ঈদগাহের ন্যায় তাকবীর সহকারে জামা‘আতের সাথে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে। [11] (৪) জুম‘আ ও ঈদ একই দিনে হ’লে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইমাম হিসাবে দু’টিই পড়েছেন। অন্যদের মধ্যে যারা ঈদ পড়েছেন, তাদের জন্য জুম‘আ অপরিহার্য করেননি।[12] অবশ্য দু’টিই আদায় করা যে অধিক ছওয়াবের কারণ, এতে কোন সন্দেহ নেই। (৫) চাঁদ ওঠার খবর পরদিন পূর্বাহ্নে পেলে সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করে ঈদের ময়দানে গিয়ে জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায় করবে। নইলে পরদিন ঈদ পড়বে।[13]

(৬) মক্কার সাথে মিলিয়ে পৃথিবীর সর্বত্র একই দিনে ছিয়াম ও ঈদ পালনের দাবী শরী‘আতের প্রকাশ্য বিরোধিতা এবং স্রেফ অযৌক্তিক দাবী মাত্র। কেননা আল্লাহ বলেন, فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি (রামাযান) মাস পাবে, সে যেন এ মাসের ছিয়াম রাখে’ (বাক্বারাহ ২/১৮৫)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ، وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ ‘তোমরা চাঁদ দেখে ছিয়াম রাখো ও চাঁদ দেখে ছিয়াম ছাড়ো’। [14] এতে প্রমাণিত হয় যে, সারা দুনিয়ার মানুষ একই সময়ে চাঁদ দেখতে পায় না। আর এটাই স্বাভাবিক। কেননা মক্কায় যখন সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা যায়, ঢাকায় তখন ৩ ঘণ্টা রাত হয়। তখন ঢাকার লোকদের কিভাবে বলা যাবে যে, তোমরা চাঁদ না দেখেও ছিয়াম রাখ বা ঈদ করো? ফলে স্বাভাবিকভাবেই ঢাকার ছিয়াম ও ঈদ মক্কার একদিন পরে চাঁদ দেখে হবে।[15]

অতিরিক্ত তাকবীর সমূহ (التكبيرات الزوائد) :

ঈদায়নের ছালাতে অতিরিক্ত বারোটি তাকবীর দেওয়া সুন্নাত।[16] যেমন

(১) আয়েশা (রাঃ) বলেন,

كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُكَبِّرُ فِى الْفِطْرِ وَالأَضْحَى فِى الأُوْلَى سَبْعَ تَكْبِيْرَاتٍ وَفِى الثَّانِيَةِ خَمْسًا سِوَى تَكْبِيْرَتَى الرُّكُوْعِ، رَوَاهُ أبو داؤدَ- وَفِى رِوَايَةٍ لِلدَّارَقُطْنِىِّ: سِوَى تَكْبِيْرَةِ الْإِسْتِفْتَاحِ-

‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঈদুল ফিৎর ও ঈদুল আযহাতে প্রথম রাক‘আতে সাত তাকবীর ও দ্বিতীয় রাক‘আতে পাঁচ তাকবীর দিতেন রুকূর দুই তাকবীর ব্যতীত’ [17] এবং ‘তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত’।[18]

(২) ‘আমর ইবনু শু‘আইব (রাঃ) তার পিতা হ’তে তিনি তার দাদা আব্দুল্লাহ ইবনে ‘আমর ইবনুল ‘আছ (রাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন যে,

عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيْهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَبَّرَ فِى الْعِيْدَيْنِ الْأَضْحَى وَالْفِطْرَ ثِنْتَىْ عَشَرَةَ تَكْبِيْرَةً فِى الْأُوْلَى سَبْعًا وَفِي الْأَخِيْرَةِ خَمْسًا سِوَى تَكْبِيْرَةِ الْإِحْرَامِ، وفى رواية: سِوَى تَكْبِيْرَةِ الصَّلاَةِ، رواه الدارقطنى والبيهقى-

অনুবাদ : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিৎরে ‘তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত’ প্রথম রাক‘আতে সাতটি ও শেষ রাক‘আতে পাঁচটি সহ মোট বারোটি (অতিরিক্ত) তাকবীর দিতেন’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘ছালাতের তাকবীর’ ব্যতীত।[19]

অত্র হাদীছটি সম্পর্কে ছাহেবে তুহফা ও ছাহেবে মির‘আত উভয়ে বলেন, الظاهر أن حديث عبد الله بن عمرو أصح شيئ فى الباب ‘এটা পরিস্কার যে, আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) বর্ণিত অত্র হাদীছটিই এ বিষয়ে সর্বাধিক বিশুদ্ধ হাদীছ’।[20]

শায়খ আলবানী (রহঃ) হাদীছটিকে ‘হাসান’ বলেছেন। ইমাম আহমাদ, ইমাম বুখারী ও তাঁর উসতায আলী ইবনুল মাদীনী হাদীছটিকে ‘ছহীহ’ বলেছেন। আল্লামা নীমভী বলেন, হাদীছটির সনদের মূল কেন্দ্রবিন্দু (مدار) হ’লেন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আত-ত্বায়েফী। তাঁকে কোন কোন বিদ্বান ‘যঈফ’ বলেছেন। ছাহেবে মির‘আত বলেন, ইমাম আহমাদ, ইমাম বুখারী, আলী ইবনুল মাদীনী প্রমুখ বিদ্বানগণের ন্যায় হাদীছ শাস্ত্রের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিবর্গের (جهابذة) বক্তব্যের পরে অন্যদের বক্তব্যের প্রতি দৃকপাত না করলেও চলে। মুজতাহিদ ইমামগণ এ হাদীছ থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন। ইবনু ‘আদী বলেন, আমর ইবনু শু‘আইব থেকে আব্দুর রহমান আত-ত্বায়েফীর সকল হাদীছ সুদৃঢ় (مسةقيمة)। হাফেয ইরাক্বী বলেন, إسناده صالح ‘অত্র হাদীছের সনদ দলীলযোগ্য’। তিরমিযীর ভাষ্যকার ছাহেবে তুহফা বলেন, فالحاصل أن حديث عبد الله بن عمرو حسن صالح الاحتجاج و يؤيده الأحاديث التى أشار إليها الترمذى– ‘সারকথা এই যে, আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমরের হাদীছটি ‘হাসান’ ও দলীল গ্রহণের যোগ্য এবং একে শক্তিশালী করে ঐ সকল হাদীছ, যেগুলির দিকে তিরমিযী ইঙ্গিত করেছেন’।[21]

(৩) কাছীর বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন,

عَنْ كَثِيْرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ عَنْ أَبِيْهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَبَّرَ فِي الْعِيْدَيْنِ فِي الْأُوْلَى سَبْعًا قَبْلَ الْقِرَاءَةِ وَفِي الْآخِرَةِ خَمْسًا قَبْلَ الْقِرَاءَةِ، رواه الترمذىُّ وابنُ ماجه-

‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঈদায়নের প্রথম রাক‘আতে ক্বিরাআতের পূর্বে সাত তাকবীর ও দ্বিতীয় রাক‘আতে ক্বিরাআতের পূর্বে পাঁচ তাকবীর দিতেন’। [22] কাছীর বিন আব্দুল্লাহ বর্ণিত উপরোক্ত হাদীছ সম্পর্কে ইমাম তিরমিযী বলেন,

حَدِيْثُ جَدِّ كَثِيْرٍ حَدِيْثٌ حَسَنٌ وَهُوَ أَحْسَنُ شَيْءٍ رُوِيَ فِيْ هَذَا الْبَابِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ-

অর্থ : হাদীছটির সনদ ‘হাসান’ এবং এটিই ঈদায়নের অতিরিক্ত তাকবীর সম্পর্কে বর্ণিত ‘সর্বাধিক সুন্দর’ রেওয়ায়াত।[23] তিনি আরও বলেন যে, আমি এ সম্পর্কে আমার উস্তায ইমাম বুখারীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,

قَالَ أَبُوْ عِيْسَى سَأَلْتُ مُحَمَّدًا يَعْنِي الْبُخَارِيَّ عَنْ هَذَا الْحَدِيْثِ فَقَالَ: لَيْسَ فِيْ هَذَا الْبَابِ شَيْئٌ أَصَحَّ مِنْ هَذَا وَبِهِ أَقُوْلُ، نقله البيهقي في السنن الكبري-

‘ঈদায়নের ছালাতের অতিরিক্ত তাকবীর সম্পর্কে এর চাইতে অধিকতর ছহীহ আর কোন রেওয়ায়াত নেই এবং আমিও সে কথা বলি’। [24]

তাকবীরে তাহরীমা সহ কি-না : ইমাম মালেক ও আহমাদ (রহঃ) তাকবীরে তাহরীমা সহ প্রথম রাক‘আতে সাত তাকবীর বলেন। ইমাম শাফেঈ, আওযাঈ, ইসহাক্ব, ইবনু হাযম প্রমুখ বিদ্বান তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত সাত তাকবীর বলেন। ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী বলেন, ‘এটাই সর্বাধিক স্পষ্ট বরং নির্দিষ্ট যে, ওটা হ’ল তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত’। [25]

কারণ (১) তাকবীরে তাহরীমা হ’ল ফরয, যা সকল ছালাতে প্রযোজ্য। আর এটি হ’ল সুন্নাত ও অতিরিক্ত, যা কেবল ঈদায়নে প্রযোজ্য। (২) কূফার গভর্ণর সাঈদ ইবনুল ‘আছ হযরত আবু মূসা আশ‘আরীকে ঈদায়নের তাকবীর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কিভাবে দিয়েছেন সেকথা জিজ্ঞেস করেন। [26] নিশ্চয়ই তিনি সেখানে তাকবীরে তাহরীমা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেননি। (৩) ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে তাঁর নিজস্ব আমল হিসাবে ৭, ৯, ১১, ১২ ও ১৩ তাকবীরের ‘আছার’ সমূহ ছহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। আলবানী বলেন, তবে তাঁর ১২ তাকবীরের বর্ণনাটিই আমার নিকট অধিকতর ছহীহ’…।[27] তাছাড়া আববাসীয় খলীফাগণ ১২ তাকবীরের অনুসারী হওয়ায় বুঝা যায় যে, ইবনু আববাস (রাঃ)-এর আমল ১২ তাকবীরের উপরে ছিল। এক্ষণে যদি তাকবীরে তাহরীমা সহ (৮+৫) ১৩ তাকবীর গণনা করা হয়, তাহ’লে পূর্বোক্ত ছহীহ হাদীছ ও অত্র আছারে কোন বিরোধ থাকে না। বরং দু’টির উপরেই আমল করা যায়। (৪) ছাহাবীর আমলের উপরে রাসূল (ছাঃ)-এর আমল নিঃসন্দেহে অগ্রাধিকারযোগ্য। (৫) শায়খ আলবানী (রহঃ) উক্ত তাকবীর সমূহকে ঈদায়নের সাথে খাছ ‘অতিরিক্ত তাকবীর’ হিসাবে গণ্য করেছেন।[28] অতএব এগুলিকে অতিরিক্ত হিসাবেই গণ্য করা উচিত এবং তা হবে ক্বিরাআতের পূর্বে, ছানার পূর্বে নয়। কেননা হাদীছে উক্ত তাকবীরগুলিকে ক্বিরাআতের পূর্বে (قبل القراءة) বলা হয়েছে। (৬) ছানার পরে অতিরিক্ত তাকবীরগুলি দিলে ফরয তাকবীরে তাহরীমা থেকে এগুলিকে পৃথক করা সহজ হয়। (৭) ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে অতিরিক্ত প্রত্যেক তাকবীরের পরে হামদ, ছানা ও দরূদ পাঠ সম্পর্কে যে ‘আছার’ বর্ণিত হয়েছে,[29] সেটি তাঁর নিজস্ব আমল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও অন্যান্য ছাহাবী থেকে এরূপ আমলের কোন নযীর নেই।[30]

উপরের আলোচনায় একথা স্পষ্ট হয় যে, তাকবীরে তাহরীমা, তাকবীরে রুকূ, তাকবীরে ছালাত ইত্যাদি ফরয তাকবীর সমূহ ছাড়াই ১ম রাক‘আতে ৭টি ও ২য় রাক‘আতে ৫টি মোট অতিরিক্ত বারোটি তাকবীর দিতে হবে।

বারো তাকবীরে চার খলীফা :

চার খলীফা ও মদীনার শ্রেষ্ঠ সাত জন তাবেঈ ফক্বীহ ও খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয সহ প্রায় সকল ছাহাবী, তাবেঈ, তিন ইমাম ও অন্যান্য শ্রেষ্ঠ ইমামগণ এবং ইমাম আবু হানীফার দুই প্রধান শিষ্য আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ (রহঃ) বারো তাকবীরের উপরে আমল করতেন। ভারতের দু’জন খ্যাতনামা হানাফী বিদ্বান আব্দুল হাই লাক্ষ্ণৌবী ও আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী বারো তাকবীরকে সমর্থন করেছেন।[31]

প্রচলিত ছয় তাকবীর : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ‘ছয় তাকবীরে’ ঈদের ছালাত আদায় করেছেন- মর্মে ছহীহ বা যঈফ কোন স্পষ্ট মরফূ হাদীছ নেই। ‘জানাযার তাকবীরের ন্যায় চার তাকবীর’ বলে মিশকাতে [32] এবং ‘নয় তাকবীর’ বলে মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাতে[33] যে হাদীছ এসেছে, সেটিও মূলতঃ ইবনু মাসঊদের উক্তি। তিনি এটিকে রাসূল (ছাঃ)-এর দিকে সম্বন্ধিত করেননি। উপরন্তু উক্ত রেওয়ায়াতের সনদ সকলেই ‘যঈফ’ বলেছেন। [34] সুতরাং ইবনু মাসঊদের সঠিক আমল কি ছিল, সে ব্যাপারেও সন্দেহ থেকে যায়। এ বিষয়ে ইমাম বায়হাক্বী বলেন,

هَذَا رَأىٌ مِنْ جِهَةِ عَبْدِ اللهِ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ وَالْحَدِيْثُ الْمُسْنَدُ مَعَ مَا عَلَيْهِ مِنْ عَمَلِ الْمُسْلِمِيْنَ أَوْلَى أَن يُّتَّبَعَ وَبِاللهِ التَّوْفِيْقِ-

অর্থৎ ‘এটি আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ)-এর ‘ব্যক্তিগত রায়’ মাত্র। অতএব রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’তে বর্ণিত মরফূ হাদীছ, যার উপরে মুসলমানদের আমল জারি আছে (অর্থাৎ বারো তাকবীর) তার উপরে আমল করাই উত্তম’।[35]

ছয় তাকবীরের তাবীল : ‘জানাযার চার তাকবীরের ন্যায়’[36] বলে ১ম রাক‘আতে তাকবীরে তাহরীমা সহ ক্বিরাআতের পূর্বে চার তাকবীর এবং ২য় রাক‘আতে রুকূর তাকবীর সহ ক্বিরাআতের পরে চার তাকবীর বলে ‘তাবীল’ (تأويل) করা হয়েছে। এর মধ্যে তাকবীরে তাহরীমা ও রুকূর ফরয তাকবীর দু’টি বাদ দিলে অতিরিক্ত (৩+৩) ছয়টি তাকবীর হয়। অথচ উক্ত যঈফ হাদীছে কোন তাকবীর বাদ দেওয়ার কথা নেই কিংবা ক্বিরাআতের আগে বা পরে বলে কোন বক্তব্য নেই।

অনুরূপভাবে মুছান্নাফে (বোম্বাই ১৯৭৯, ২/১৭৩) বর্ণিত ‘নয় তাকবীর’ থেকে তাকবীরে তাহরীমা এবং ১ম ও ২য় রাক‘আতের রুকূর তাকবীর দু’টিসহ মোট তিনটি ফরয তাকবীর বাদ দিলে অতিরিক্ত ছয়টি তাকবীর হয়। এভাবেই তাবীল করে ছয় তাকবীর করা হয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ বা তাঁর রাসূল (ছাঃ) কাউকে দেননি।

ইবনু হাযম আন্দালুসী (রহঃ) বলেন, ‘জানাযার চার তাকবীরে ন্যায়’ মর্মের বর্ণনাটি যদি ‘ছহীহ’ বলে ধরে নেওয়া হয়, [37] তথাপি এর মধ্যে ছয় তাকবীরের পক্ষে কোন দলীল নেই। কারণ তাকবীরে তাহরীমা সহ ১ম রাক‘আতে চার ও রুকূর তাকবীর সহ ২য় রাক‘আতে চার তাকবীর এবং ১ম রাক‘আতে ক্বিরাআতের পূর্বে ও ২য় রাক‘আতে ক্বিরাআতের পরে তাকবীর দিতে হবে বলে কোন কথা সেখানে নেই। বরং এটাই স্পষ্ট যে, দুই রাক‘আতেই জানাযার ছালাতের ন্যায় চারটি করে (অতিরিক্ত) তাকবীর দিতে হবে’।[38]

অথচ এ বিষয়ে ১২ তাকবীরের স্পষ্ট ছহীহ হাদীছের উপরে সকলে আমল করলে সুন্নী মুসলমানেরা অন্ততঃ বৎসরে দু’টি ঈদের খুশীর দিনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ছালাত ও ইবাদত করতে পারত। কিন্তু দ্বীনের দোহাই দিয়েই আমরা দ্বীনদারদের বিভক্ত করে রেখেছি। অথচ শরী‘আতে এর কোন ভিত্তি নেই।

ঈদায়নের ছালাতের পদ্ধতি (كيفية صلاة العيدين) :

১ম রাক‘আতে তাকবীরে তাহরীমা ও ছানা পাঠের পর ধীরস্থিরভাবে স্বল্প বিরতি সহ পরপর সাত তাকবীর দিবে। অতঃপর আঊযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ ইমাম সরবে সূরায়ে ফাতিহা ও অন্য সূরা পড়বেন এবং মুক্তাদীগণ চুপে চুপে কেবল সূরায়ে ফাতিহা পড়বে। অনুরূপভাবে ২য় রাক‘আতে দাঁড়িয়ে ধীরস্থিরভাবে পরপর পাঁচটি তাকবীর দিয়ে কেবল ‘বিসমিল্লাহ’ সহ সূরায়ে ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পড়বে। এ সময় মুক্তাদীগণ চুপে চুপে কেবল সূরা ফাতিহা পড়বে।

প্রথম রাক‘আতে সূরায়ে ক্বাফ অথবা আ‘লা এবং দ্বিতীয় রাক‘আতে সূরায়ে ক্বামার অথবা গা-শিয়াহ পড়বে’। [39] অন্য সূরাও পড়া যাবে।[40] প্রতি তাকবীরে হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠাবে ও বাম হাতের উপর ডান হাত বুকে বাঁধবে। অতিরিক্ত তাকবীর সমূহ বলতে ভুলে গেলে বা গণনায় ভুল হ’লে তা পুনরায় বলতে হয় না বা ‘সিজদায়ে সহো’ লাগে না।[41]


[1] . মির‘আত ৫/২১; ছফিউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম (রিয়াদ : দারুস সালাম ১৪১৪/১৯৯৪), ২৩১-৩২ পৃঃ।
[2] . আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৪৩৯ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘ঈদায়নের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৭।
[3] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২০৪৮ ‘ছওম’ অধ্যায়-৭, ‘নফল ছিয়াম’ অনুচ্ছেদ-৬; মুসলিম, মিশকাত হা/২০৫০; মির‘আত ৬/৬৯।
[4] . মির‘আত ৫/২২-২৩।
[5] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৩৬।
[6] . আবুদাঊদ হা/১১৪৫, সনদ হাসান; ঐ, মিশকাত হা/১৪৪৪; মির‘আত ৫/৫৮।
[7] . মির‘আত ২/৩৩০-৩৩১; ঐ, ৫/৩১।
[8] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৪৩১ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘দুই ঈদের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৭; মির‘আত ২/৩৩১; ঐ, ৫/৩১।
[9] . আবুদাঊদ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৪৪৮; সনদ যঈফ; মির‘আত ২/৩২৭; ঐ, ৫/২২; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৩৭।
[10] . মির‘আত ৫/৬৪-৬৫।
[11] . বুখারী (ফাৎহ সহ) ২/৫৫০-৫১ পৃঃ, ‘দুই ঈদের ছালাত’ অধ্যায়-১৩, অনুচ্ছেদ-২৫।
[12] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৩১৬; ঐ, ১/২৩৬; নায়লুল আওত্বার ৪/২৩১।
[13] . আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/১৪৫০; মির‘আত ৫/৬৪; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৪১।
[14] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৯৭০।
[15] . দ্রঃ মাসিক আত-তাহরীক, রাজশাহী, বাংলাদেশ, ৮/৪ সংখ্যা, জানুয়ারী ২০০৫, প্রশ্নোত্তর ১/১২১; ঐ, ১৪/১১ সংখ্যা, আগষ্ট ২০১১, প্রশ্নোত্তর ৩৩/৪৩৩।
[16] . এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা দেখুন লেখক প্রণীত ‘মাসায়েলে কুরবানী ও আক্বীক্বা’ ৩৪-৪৩ পৃঃ।
[17] . আবুদাঊদ হা/১১৫০; ইবনু মাজাহ হা/১২৮০, সনদ ছহীহ।
[18] . দারাকুৎনী (বৈরূত : ১৪১৭/১৯৯৬) হা/১৭০৪, ১৭১০, সনদ ছহীহ; আলবানী, ইরওয়াউল গালীল হা/৬৩৯-এর ব্যাখ্যা দ্র: ৩/১০৭-০৮; বায়হাক্বী ৩/২৮৭।
[19] . দারাকুৎনী হা/১৭১২, ১৭১৪ ‘ঈদায়েন’ অধ্যায়, সনদ হাসান; বায়হাক্বী ২/২৮৫ পৃঃ। হাদীছের শেষাংশটি দারাকুৎনী ও বায়হাক্বীতে এসেছে। এতদ্ব্যতীত হাদীছটি বর্ণিত হয়েছে আবুদাঊদ হা/১১৫১ ‘ছহীহ’; ইবনু মাজাহ হা/১২৭৮ ‘হাসান ছহীহ’; আলবানী, ছহীহ আবুদাঊদ হা/১০২০; ছহীহ ইবনু মাজাহ হা/১০৬৩।
[20] . তুহফাতুল আহওয়াযী ৩/৮২; মির‘আতুল মাফাতীহ ৫/৫৫ পৃঃ। ইমাম শাওকানী (রহঃ) ঈদায়নের অতিরিক্ত তাকবীর বিষয়ে ১০টি মতভেদ উল্লেখ করে ১২ তাকবীরকেই ‘সর্বাগ্রগণ্য’ (أرجح الأقوال) হিসাবে মন্তব্য করেছেন। দ্রঃ নায়ল ৪/২৫৭ পৃঃ।
[21] . আব্দুর রহমান মুবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযী শরহ জামে‘ তিরমিযী (মদীনা: মাকতাবা সালাফিইয়াহ ১৩৮৪/১৯৬৪) ৩/৮৫; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী ২/২৩৮।
[22] . জামে‘ তিরমিযী (দিল্লী : ১৩০৮ হিঃ) ১/৭০ পৃঃ; মিশকাত হা/১৪৪১ ‘দুই ঈদের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৭; তিরমিযী হা/৫৩৬; ছহীহ তিরমিযী হা/৪৪২; ইবনু মাজাহ হা/১২৭৯; ছহীহ ইবনু মাজাহ হা/১০৬৪; মির‘আত হা/১৪৫৬, ৫/৪৬-৪৮।
[23] . তিরমিযী (দিল্লী: ১৩০৮ হিঃ), ১/৭০; আলবানী, ছহীহ তিরমিযী হা/৪৪২, ইবনু মাজাহ (বৈরূত : তাবি) হা/১২৭৯।
[24] . বায়হাক্বী (বৈরূত ছাপা, তাবি) ৩/২৮৬; মির‘আত ২/৩৩৯; ঐ, ৫/৫০-৫১।
[25] . মির‘আত ২/৩৩৮; ঐ, ৫/৪৬।
[26] . আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৪৪৩ ‘দুই ঈদের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৭।
[27] . আলবানী, ইরওয়াউল গালীল ৩/১১২।
[28] . ইরওয়াউল গালীল ৩/১১৩।
[29] . ত্বাবারানী, ইরওয়াউল গালীল হা/৬৪২, ৩/১১৪।
[30] . বায়হাক্বী ৩/২৯০-৯১; মির‘আত ২/৩৪২; ঐ, ৫/৫৪ পৃঃ।
[31] . মির‘আত’ ২/৩৩৮, ৩৪১; ঐ, ৫/৪৬, ৫২।
[32] . আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৪৪৩ ‘দুই ঈদের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৭, হাদীছ যঈফ।
[33] . মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ (বোম্বাই ছাপা: ১৯৭৯), ২/১৭৩ পৃঃ।
[34] . বায়হাক্বী ৩/২৯০; নায়ল ৪/২৫৪, ২৫৬; মির‘আত ৫/৫৭; আলবানী, মিশকাত হা/১৪৪৩।
[35] . বায়হাক্বী ৩/২৯১; মির‘আত ৫/৫১।
[36] . আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৪৪৩ ‘দুই ঈদের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৪৭।
[37] . যেমন ত্বাহাবী, শরহ মা‘আনিল আছার ৬/২৫ পৃঃ; আলবানী, ছহীহাহ হা/২৯৯৭; আবুদাঊদ হা/১১৫৩; যদিও তাহকীক মিশকাতে (হা/১৪৪৩; বৈরূত : ৩য় সংস্করণ ১৪০৫/১৯৮৫) ও মিশকাতের সর্বশেষ তাহকীকে তিনি ‘যঈফ’ বলেছেন (হেদায়াতুর রুওয়াত ইলা তাখরীজি আহা-দীছিল মাছা-বীহ ওয়াল মিশকাত; দাম্মাম, সঊদী আরব, ১ম প্রকাশ ১৪২২/২০০১) হা/১৩৮৮, ২/১২১ পৃঃ।
[38] . ইবনু হাযম, মুহাল্লা (বৈরূত : দারুল ফিকর, তাবি) ৫/৮৪ পৃঃ।
[39] . মুসলিম, মিশকাত হা/৮৪০-৪১ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘ছালাতে ক্বিরাআত’ অনুচ্ছেদ-১২।
[40] . আবুদাঊদ হা/৮১৮, ৮২০, ৮৫৯।
[41] . মির‘আত হা/১৪৫৭, ২/৩৪১ পৃঃ; ঐ; হা/১৪৫৫-এর আলোচনা ৫/৫৩-৫৪; ইরওয়া ৩/১১৩।


৬. জানাযার ছালাত (صلاة الجنازة)


হুকুম : প্রত্যেক মুসলিম আহলে ক্বিবলার উপর জানাযার ছালাত ‘ফরযে কেফায়াহ’।[1] অর্থাৎ মুসলমানদের কেউ জানাযা পড়লে উক্ত ফরয আদায় হয়ে যাবে। না পড়লে সবাই দায়ী হবে। ছালাত হিসাবে অন্যান্য ছালাতের ন্যায় ওযূ, ক্বিবলা, সতর ঢাকা ইত্যাদি ছালাতে জানাযার শর্তাবলীর অন্তর্ভুক্ত। তবে পার্থক্য এই যে, জানাযার ছালাতে কোন রুকূ-সিজদা বা বৈঠক নেই এবং এ ছালাতের জন্য নির্দিষ্ট কোন ওয়াক্ত নেই। বরং দিনে-রাতে সকল সময় এমনকি নিষিদ্ধ তিন সময়েও পড়া যায়।[2]

ওয়াজিব সমূহ : ছয়টি : (১) দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করা (২) চার তাকবীর দেওয়া (৩) সূরায়ে ফাতিহা পাঠ করা (৪) দরূদ পাঠ করা (৫) মাইয়েতের জন্য খালেছ অন্তরে দো‘আ করা (৬) সালাম ফিরানো।

সুন্নাত সমূহ : পাঁচটি : (১) জামা‘আত সহকারে ছালাত আদায় করা (২) কমপক্ষে তিনটি কাতার হওয়া (৩) ইমাম বা একাকী মুছল্লীর জন্য পুরুষের মাথা ও মেয়েদের কোমর বরাবর দাঁড়ানো (৪) ফাতিহা ব্যতীত অন্য একটি সূরা এবং হাদীছে বর্ণিত দো‘আ সমূহ পাঠ করা (৫) ছালাত শেষে জানাযা উঠানো পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা। [3] বাকী সবই ‘মুস্তাহাব’। যদি ভুলক্রমে তিন তাকবীর হয়ে যায়, তবে পুনরায় ইমাম চতুর্থ তাকবীর দিবেন। যদি মুক্তাদীর কোন তাকবীর ছুটে যায়, তবে শেষে তাকবীর দিয়ে সালাম ফিরাবে। আর যদি না দেয় তাতেও দোষ নেই।[4]

ফযীলত : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় কোন জানাযায় শরীক হ’ল এবং দাফন শেষে ফিরে এলো, সে ব্যক্তি দুই ‘ক্বীরাত’ সমপরিমাণ নেকী পেল। প্রতি ‘ক্বীরাত’ ওহোদ পাহাড়ের সমতুল্য। আর যে ব্যক্তি কেবলমাত্র জানাযা পড়ে ফিরে এলো, সে এক ‘ক্বীরাত’ পরিমাণ নেকী পেল’। [5]

কাতার দাঁড়ানো : ইমামের পিছনে কাঁধে কাঁধ ও পায়ে পা মিলিয়ে কাতার দিবে।[6] এ সময় জামার হাতাগুলো খুলে দিবে ও টাখনুর উপরে কাপড় রাখবে।[7] জুতা-স্যান্ডেল খোলার প্রয়োজন নেই। যদি তাতে নাপাকী থাকে, তবে তা মাটিতে ঘষে নিলেই যথেষ্ট হবে। [8] এ সময় জুতা-স্যান্ডেল থেকে পা বের করে তার উপরে দাঁড়ানো স্রেফ বোকামি। মাইয়েতকে উত্তর মাথা করে ক্বিবলার দিকে সামনে রাখবে।[9] যদি মাইয়েত পুরুষ হন, তবে ইমাম মাইয়েতের মাথা বরাবর দাঁড়াবেন। আর যদি মহিলা হন, তবে মাইয়েতের কোমর বরাবর দাঁড়াবেন।[10] মাইয়েত একত্রে একাধিক হ’লে এবং পুরুষ ও নারী হ’লে পুরুষের লাশ ইমামের কাছাকাছি সম্মুখে রাখবে। অতঃপর মহিলার লাশ থাকবে। যদি শিশু ও মহিলা হয়, তাহ’লে শিশুর লাশ প্রথমে ও মহিলার লাশ পরে থাকবে।

ইমামের পিছনে তিনটি কাতার দেওয়া মুস্তাহাব।[11] ১ম কাতারে ইমামের কাছাকাছি মাইয়েতের উত্তরাধিকারীগণ ও দ্বীনদার গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ দাঁড়াবেন। চারজন হ’লে ইমামের পিছনে দু’জন দু’জন করে দাঁড়াবেন।[12] ইমাম ব্যতীত একজন পুরুষ ও একজন মহিলা মুক্তাদী হ’লে ইমামের পিছনে পুরুষ ও তার পিছনে মহিলা দাঁড়াবেন। মুক্তাদী একজন হ’লে তিনি ইমামের পিছনে দাঁড়াবেন। কোন লোক না পেলে একাকী জানাযা পড়বেন।[13] তবে শিরক ও বিদ‘আতী আক্বীদা ও আমল মুক্ত দ্বীনদার মুছল্লীর সংখ্যা জানাযায় যত বেশী হবে, মাইয়েতের জন্য তা তত বেশী উপকারী হবে এবং তাদের দো‘আ কবুল করা হবে’।[14]

ইমামত : মাইয়েত কোন ন্যায়নিষ্ঠ ও পরহেযগার ব্যক্তিকে অছিয়ত করে গেলে তিনিই জানাযা পড়াবেন। নইলে ‘আমীর’ বা তাঁর প্রতিনিধি অথবা মাইয়েতের কোন যোগ্য নিকটাত্মীয়, নতুবা স্থানীয় মসজিদের ইমাম বা অন্য কোন মুত্তাক্বী আলেম জানাযায় ইমামতি করবেন। মৃত ব্যক্তি দু’জন ব্যক্তির নামেও অছিয়ত করে যেতে পারেন। [15]

জানাযার ছালাতের বিবরণ (صفة صلاة الجنازة) :

জানাযার ছালাতে চার তাকবীর দিবে। পাঁচ থেকে নয় তাকবীর পর্যন্ত প্রমাণিত আছে। তবে চার তাকবীরের হাদীছ সমূহ অধিকতর ছহীহ ও সংখ্যায় অধিক। মুক্তাদী ইমামের পিছে পিছে তাকবীর বলবে।[16] প্রথমে মনে মনে জানাযার নিয়ত করে সরবে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে দু’হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে বাম হাতের উপর ডান হাত বুকে বাঁধবে। এ সময় ‘ছানা’ পড়বে না।[17] নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীছ সর্বসম্মতভাবে ‘যঈফ’।[18] আনাস, ইবনে ওমর, ইবনে আববাস (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবীগণ সকল তাকবীরেই হাত উঠাতেন।[19] অতঃপর আ‘ঊযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ সূরায়ে ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পড়বে। [20] তারপর ২য় তাকবীর দিবে ও দরূদে ইবরাহীমী পাঠ করবে, যা আত্তাহিইয়াতু-র পরে পড়া হয়। তারপর ৩য় তাকবীর দিবে ও নিম্নোক্ত দো‘আ সমূহ পড়বে। দো‘আ পাঠ শেষে ৪র্থ তাকবীর দিয়ে প্রথমে ডাইনে ও পরে বামে সালাম ফিরাবে। ডাইনে একবার মাত্র সালাম ফিরানোও জায়েয আছে। [21]

জানাযার ছালাত সরবে ও নীরবে পড়া যায়।[22] ইমাম সরবে পড়লে মুক্তাদীগণ আ‘ঊযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ কেবল সূরায়ে ফাতিহা চুপে চুপে পড়বে এবং পরে দরূদ ও অন্যান্য দো‘আ সমূহ পড়বে। তবে ইমাম নীরবে পড়লে মুক্তাদীগণ সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা এবং অন্যান্য দো‘আ সমূহ পড়বে।

জানাযার পূর্বে করণীয় : জানাযার পূর্বে মৃতের জন্য প্রথম করণীয় হ’ল তার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করা। এজন্য তার সকল সম্পদ বিক্রি করে হ’লেও তা করতে হবে। যদি তার কিছুই না থাকে, তাহ’লে তার নিকটাত্মীয়, সমাজ, সংগঠন বা সরকার সে দায়িত্ব বহন করবে’।[23]

জানাযা বিষয়ে সতর্কতা :

মহাপাপী কোন মুসলিম যেমন কোন ব্যভিচারী, মদ্যপায়ী, চোর-দস্যু-সন্ত্রাসী, আত্মঘাতি, জারজ সন্তান, কবর ও মূর্তি পূজারী, মুশরিক ও বিদ‘আতী যতক্ষণ না সে প্রকাশ্যে কুফরী ঘোষণা করে, আমানতের খেয়ানতকারী প্রভৃতি লোকদের জানাযা কোন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও পরহেযগার আলেমগণ পড়বেন না। তবে সাধারণ লোকেরা পড়বেন। [24]

ঋণগ্রস্ত, আত্মহত্যাকারী ও বায়তুল মাল বা অন্যের সম্পদ আত্মসাৎকারীর জানাযা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে পড়েননি, বরং অন্যকে পড়তে বলেন।[25] ‘এটি ছিল তাঁর পক্ষ থেকে অন্যকে আদব শিখানোর জন্য’। [26]

(১) খায়বার কিংবা হোনায়েন-এর যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জনৈক সাথী বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে। লোকেরা তার উচ্চ প্রশংসা করলে রাসূল (ছাঃ) বললেন, ঐ ব্যক্তি জাহান্নামের অধিবাসী। তখন একজন গোপনে তার পিছু নিল। দেখা গেল যে, ঐ ব্যক্তি যুদ্ধের এক পর্যায়ে আহত হ’ল। অতঃপর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে নিজের অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করল। তখন লোকটি ছুটে এসে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সবাইকে ডেকে বললেন, সত্যিকারের মুমিন ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। মনে রেখ অনেক লোক জান্নাতী আমল করে। কিন্তু মৃত্যুকালে জাহান্নামী হয়ে যায়। আবার অনেকে জাহান্নামের আমল করে, কিন্তু মৃত্যুকালে জান্নাতী হয়ে যায়। অতঃপর তিনি বলেন إِنَّ اللهَ يُؤَيِّدُ هَذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এই দ্বীনকে সাহায্য করেন অনেক পাপী লোকের মাধ্যমে’।[27]

আল্লাহ বলেন,وَلاَ تَقْتُلُوْا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيْمًا ‘তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অতিশয় দয়াবান’ (নিসা ৪/২৯)।

(২) খায়বার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথীদের মধ্যে একজন নিহত হ’লে তিনি বলেন, صَلُّوْا عَلَى صَاحِبِكُمْ ‘তোমরা তোমাদের সাথীর জানাযা পড়’। এতে তাদের মন খারাপ হলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের বললেন, إِنَّ صَاحِبَكُمْ غَلَّ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ ‘তোমাদের সাথীটি আল্লাহর রাস্তায় খেয়ানত করেছে’। পরে অনুসন্ধানে তার থলিতে ইহুদীদের কণ্ঠহারের একটি ছিদ্রযুক্ত ছোট পাথরের লকেট (خَرَزٌ) পাওয়া গেল (যা গণীমতের মাল ছিল)। যার মূল্য দুই দিরহামেরও কম। [28]

(৩) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে হাদিয়া হিসাবে পাঠানো গোলাম মিদ‘আম (مِدْعَم) খায়বার যুদ্ধে নিহত হ’লে লোকেরা তার জান্নাতের সুসংবাদ বলতে থাকলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাগতঃস্বরে বলেন, কখনোই না। আল্লাহর কসম! গণীমতের মাল থেকে যে চাদরটি সে চুরি করেছে, তা তাকে আগুনে পোড়াবে’। [29]

(৪) অন্য হাদীছে এসেছে, ‘মুমিনের নফ্স তার ঋণের সাথে লটকানো থাকে এবং সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না তার ঋণ পারিশোধ করা হয়’। [30]

(৫) যারা শরীক ফাঁকি দেয় কিংবা শক্তির জোরে বা ছল-চাতুরী করে অন্যের জমি ও সম্পদ আত্মসাৎ করে, তাদের জানাযা কোন পরহেযগার আলেমের পড়া উচিৎ নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ أَخَذَ شِبْرًا مِنَ الْأَرْضِ ظُلْمًا فَإِنَّهُ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ سَبْعِ أَرْضِيْنَ ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারু জমি দখল করে, ক্বিয়ামতের দিন সাত তবক যমীন তার গলায় বেড়ীরূপে পরিয়ে দেওয়া হবে’।[31] অন্য বর্ণনায় এসেছে, مَنْ أَخَذَ أَرْضًا بِغَيْرِ حَقِّهَا كُلِّفَ أَنْ يَّحْمِلَ تُرَابَهَا الْمَحْشَرَ ‘…তাকে ক্বিয়ামতের দিন ঐ মাটির বোঝা মাথায় বহন করে চলতে বাধ্য করা হবে’।[32]

উপরোক্ত ব্যক্তিগণ কবীরা গোনাহগার। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ছালাত তরককারী ব্যক্তিকে হাদীছে ‘কাফির’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। [33] তাহ’লে কিভাবে তার জানাযা পড়া যেতে পারে? আল্লাহ আমাদের হেদায়াত করুন- আমীন!

জানাযার দো‘আ (دعاء الجنازة) :

অনেকগুলি দো‘আর মধ্যে নিম্নের দো‘আটি সুপরিচিত।-

1- اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيْرِنَا وَكَبِيْرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا، اَللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلاَمِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الْإِيْمَانِ، اَللَّهُمَّ لاَ تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ وَلاَ تَفْتِنَّا بَعْدَهُ-

(১) উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগ্ফির লিহাইয়েনা ওয়া মাইয়েতেনা ওয়া শা-হেদেনা ওয়া গা-য়েবেনা ওয়া ছাগীরেনা ওয়া কাবীরেনা ওয়া যাকারেনা ওয়া উন্ছা-না, আল্লা-হুম্মা মান আই্য়াইতাহূ মিন্না ফাআহ্য়িহী ‘আলাল ইসলাম, ওয়া মান তাওয়াফ্ফায়তাহূ মিন্না ফাতাওফ্ফাহূ ‘আলাল ঈমান। আল্লা-হুম্মা লা তাহরিমনা আজরাহূ ওয়া লা তাফ্তিন্না বা‘দাহূ।
অনূবাদ : ‘হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত ও মৃত এবং (এই জানাযায়) উপস্থিত-অনুপস্থিত আমাদের ছোট ও বড়, পুরুষ ও নারী সকলকে আপনি ক্ষমা করুন। যাকে আপনি বাঁচিয়ে রাখবেন, তাকে ইসলামের উপরে বাঁচিয়ে রাখুন এবং যাকে মারতে চান, তাকে ঈমানের হালতে মৃত্যু দান করুন। হে আল্লাহ! এই মাইয়েতের (জন্য দো‘আ করার) উত্তম প্রতিদান হ’তে আপনি আমাদেরকে বঞ্চিত করবেন না এবং তার পরে আমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলবেন না’।[34]

(২) আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দো‘আ যা প্রথমটির সাথে যোগ করে পড়া যায় বিশেষভাবে মাইয়েতের উদ্দেশ্যে। যেমন-

2- اَللَّهُمَّ اغْفِرْلَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ وَوَسِّعْ مَدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّيْ الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِّنْ دَارِهِ وَأَهْلاً خَيْرًا مِّنْ أَهْلِهِ وَزَوْجًا خَيْرًا مِّنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَ مِنْ عَذَابِ النَّارِ-

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগ্ফির লা-হূ ওয়ারহামহু ওয়া ‘আ-ফিহি ওয়া‘ফু ‘আনহু ওয়া আকরিম নুযুলাহূ ওয়া ওয়াস্সি‘ মাদ্খালাহূ; ওয়াগ্সিলহু বিলমা-এ ওয়াছ্ছালজে ওয়াল বারাদে; ওয়া নাক্বক্বিহি মিনাল খাত্বা-য়া কামা ইউনাক্বক্বাছ্ ছাওবুল আবইয়াযু মিনাদ্ দানাসি; ওয়া আবদিলহু দা-রান খায়রান মিন দা-রিহী ওয়া আহলান খায়রাম মিন আহলিহী ওয়া যাওজান খায়রাম মিন যাওজিহী; ওয়া আদখিল্হুল জান্নাতা ওয়া আ‘ইয্হু মিন ‘আযা-বিল ক্বাবরে ওয়া মিন ‘আযা-বিন না-রে ।
অনুবাদ : হে আল্লাহ! আপনি এই মাইয়েতকে ক্ষমা করুন। তাকে অনুগ্রহ করুন। তাকে নিরাপদে রাখুন এবং তার গোনাহ মাফ করুন। আপনি তাকে সম্মানজনক আতিথেয়তা প্রদান করুন। তার বাসস্থান প্রশস্ত করুন। আপনি তাকে পানি দ্বারা, বরফ দ্বারা ও শিশির দ্বারা ধৌত করুন এবং তাকে পাপ হ’তে এমনভাবে মুক্ত করুন, যেমনভাবে সাদা কাপড় ময়লা হ’তে ছাফ করা হয়। আপনি তাকে দুনিয়ার গৃহের বদলে উত্তম গৃহ দান করুন। তার দুনিয়ার পরিবারের চাইতে উত্তম পরিবার এবং দুনিয়ার জোড়ার চাইতে উত্তম জোড়া দান করুন। তাকে আপনি জান্নাতে দাখিল করুন এবং তাকে কবরের আযাব হ’তে ও জাহান্নামের আযাব হ’তে রক্ষা করুন’।[35]

3- اَللَّهُمَّ إِنَّ فُلاَنَ بْنَ فُلاَنٍ فِيْ ذِمَّتِكَ وَحَبْلِ جِوَارِكَ، فَقِهِ مِنْ فِتْنَةِ الْقَبْرِ وَعَذَابِ النَّارِ، وَأَنْتَ أَهْلُ الْوَفَاءِ وَالْحَقِّ، اَللَّهُمَّ اغْفِرْلَهُ وَارْحَمْهُ، إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُوْرالرَّحِيْمُ-

(৩) উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ইন্না ফুলা-নাবনা ফুলা-নিন ফী যিম্মাতিকা ওয়া হাবলি জিওয়া-রিকা; ফাক্বিহী মিন ফিৎনাতিল ক্বাবরি ওয়া ‘আযা-বিন্না-রি; ওয়া আন্তা আহলুল ওয়াফা-ই ওয়াল হাক্বক্বি। আল্লা-হুম্মাগফিরলাহূ ওয়ারহামহু, ইন্নাকা আন্তাল গাফূরুর রহীম ।
অনুবাদ : হে আল্লাহ! অমুকের পুত্র অমুক আপনার যিম্মায় ও আপনার তত্ত্বাবধানে আবদ্ধ। অতএব আপনি তাকে কবরের পরীক্ষা ও জাহান্নামের আযাব হ’তে রক্ষা করুন। আপনি ওয়াদা ও সত্যের মালিক। হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন ও তাকে অনুগ্রহ করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান।[36]

4- اَللَّهُمَّ عَبْدُكَ وَابْنُ أَمَتِكَ احْتَاجَ إِلَى رَحْمَتِكَ، وَأَنْتَ غَنِيٌّ عَنْ عَذَابِهِ، إِنْ كَانَ مُحْسِنًا فَزِدْ فِي حَسَنَاتِهِ، وَإِنْ كَانَ مُسِيْئًا فَتَجَاوَزْ عَنْهُ-

(৪) উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ‘আব্দুকা ওয়া ইবনু আমাতিকা, ইহতা-জা ইলা রহমাতিকা ওয়া আনতা গানিইয়ুন ‘আন ‘আযা-বিহী। ইন কা-না মুহসিনান ফাযিদ ফী হাসানা-তিহী; ওয়া ইন কা-না মুসীআন, ফাতাজা-ওয়ায ‘আনহু।
অনুবাদ : হে আল্লাহ! মাইয়েত আপনার বান্দা এবং সে আপনার এক বান্দীর সন্তান। সে আপনার রহমতের ভিখারী। আপনি তাকে শাস্তি দিতে বাধ্য নন। অতএব যদি সে সৎকর্মশীল হয়, তাহ’লে তার নেকী বাড়িয়ে দিন। আর যদি অন্যায়কারী হয়, তাহ’লে তাকে আপনি ক্ষমা করে দিন’।[37]

(৫) মাইয়েত শিশু হ’লে সূরা ফাতিহা, দরূদ ও জানাযার ১ম দো‘আটি পাঠের পর নিম্নোক্ত দো‘আ পড়বে-

5- اَللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا سَلَفًا وَّ فَرَطًا وَّ ذُخْرًا وَّ أَجْرًا ، رواه البخاريُّ تعليقًا-

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাজ‘আলহু লানা সালাফাওঁ ওয়া ফারাত্বাওঁ ওয়া যুখ্রাওঁ ওয়া আজরান’। ‘লানা’-এর সাথে ‘ওয়া লে আবাওয়াইহে’ (এবং তার পিতা-মাতার জন্য) যোগ করে বলা যেতে পারে।[38]
অনুবাদ : ‘হে আল্লাহ! আপনি এই শিশুকে আমাদের জন্য (এবং তার পিতা-মাতার জন্য) পূর্বগামী, অগ্রগামী এবং আখেরাতের পুঁজি ও পুরস্কার হিসাবে গণ্য করুন’! [39]

জানাযার দো‘আর আদব (آداب دعاء الجنازة) :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, إِذَا صَلَّيْتُمْ عَلَى الْمَيِّتِ فَأَخْلِصُوْا لَهُ الدُّعَاءَ– ‘যখন তোমরা জানাযার ছালাত আদায় করবে, তখন মাইয়তের জন্য খালেছ অন্তরে দো‘আ করবে’।[40] অতএব মাইয়েত ভাল-মন্দ যাই-ই হৌক না কেন, তার জন্য খোলা মনে দো‘আ করতে হবে। কবুল করা বা না করার মালিক আল্লাহ। ছাহেবে ‘আওন বলেন, অত্র হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মৃতের জন্য নির্দিষ্ট কোন দো‘আ নেই। বরং যেকোন প্রার্থনা করা যেতে পারে। শাওকানীও সেকথা বলেন। তবে তিনি বলেন যে, হাদীছে বর্ণিত দো‘আ সমূহ পাঠ করাই উত্তম। এই সময় সর্বনাম সমূহ পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। কেননা ‘মাইয়েত’ এখানে উদ্দেশ্য। ‘মাইয়েত’ (مَيِّتٌ) আরবী শব্দ, যা স্ত্রী ও পুরুষ উভয় লিঙ্গে ব্যবহৃত হয়।[41]

মৃত্যুকালীন সময়ে করণীয় (الأعمال عند من حضره الموت)

(ক) তালক্বীন করানো : ‘তালক্বীন’ (التلقين) অর্থ: কথা বুঝানো বা দ্রুত মুখস্থ করে নেওয়া। মৃত্যুর আলামত দেখা গেলে রোগীর শিয়রে বসে তাকে কালেমায়ে ত্বাইয়িবা ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ পড়ানো উচিত।[42] যাতে সে দ্রুত মুখস্থ বা স্মরণ করে নেয়। তাওহীদের স্বীকৃতিবাচক এই কালেমাই তাকে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছা্ঃ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তির সর্বশেষ বাক্য হবে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ (অর্থ : নেই কোন উপাস্য আল্লাহ ব্যতীত), সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[43] জমহূর বিদ্বানগণ কেবল লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ পড়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। কেননা হাদীছে কেবল এতটুকুই এসেছে।[44]

তালক্বীনের অর্থ মৃত্যুমুখী ব্যক্তিকে কেবল কালেমা শুনানো নয়। বরং তাকে কালেমা পড়ানোর চেষ্টা করা। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জনৈক আনছার রোগীকে দেখতে গেলেন ও বললেন, হে মামু! আপনি পড়ুন লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ। তিনি বললেন যে, আমাকে এখতিয়ার দিন, আমি নিজেই পড়ি…। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, হ্যাঁ’।[45] কিন্তু কালেমা পড়ানোর জন্য চাপাচাপি করা উচিত নয়। তাতে মুখ দিয়ে বেফাস কথা বের হয়ে যেতে পারে। একবার বলানোর পরে দ্বিতীয়বার চেষ্টা না করা উচিত। যাতে এই কালেমাই তার শেষ বাক্য হয়। এই সময় তাকে ক্বিবলামুখী করার জন্য উত্তর দিকে মাথা করে বিছানা ঠিক করে দেওয়া সম্পর্কে কোন ছহীহ হাদীছ নেই। খ্যাতনামা তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবকে ক্বিবলামুখী করে বিছানা ঘুরিয়ে দিলে হুঁশ ফেরার পর তিনি পুনরায় পূর্বের ন্যায় শয়ন করেন ও বলেন, মাইয়েত কি মুসলমান নয়? [46] এই সময় মাইয়েতের শিয়রে বসে সূরা ইয়াসীন পাঠ করার হাদীছ ‘যঈফ’।[47]

মৃত্যুর পরে দো‘আ সমূহ এবং করণীয় :

(১) মৃত্যু হওয়ার পরে উপস্থিত সকলে এবং যারা শুনবেন তারা প্রত্যেকে إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ‘ইন্না লিল্লা-হে ওয়া ইন্না ইলাইহে রা-জে‘ঊন’ (অর্থ : ‘আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী’) পাঠ করবে এবং আল্লাহ-নির্ধারিত তাক্বদীরের উপরে ছবর করবে ও সন্তুষ্ট থাকবে। অতঃপর (২) মৃতের চোখ দু’টি বন্ধ করে দিবে। [48] সারা দেহ ও মুখমন্ডল কাপড় দিয়ে ঢেকে দিবে।[49] তবে (হজ্জ বা ওমরাহ কালে) ‘মুহরিম’ ব্যক্তির মুখ ও মাথা খোলা থাকবে। কেননা তিনি ক্বিয়ামতের দিন ‘তালবিয়া’ পাঠ করতে করতে উঠবেন। [50]

(৩) এই সময় মাইয়েতের নিকটতম ব্যক্তি এই দো‘আ পড়বে : اَللَّهُمَّ أَجِرْنِي فِيْ مُصِيْبَتِيْ وَأَخْلِفْ لِيْ خَيْرًا مِّنْهَا ‘আল্লা-হুম্মা আজিরনী ফী মুছীবাতী ওয়া আখলিফ্লী খায়রাম মিনহা’ (অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাকে বিপদে ধৈর্য ধারণের পারিতোষিক দান কর এবং আমাকে এর উত্তম প্রতিদান দাও’)।[51] (৪) এসময় মৃতের জন্য নিম্নোক্ত দো‘আটি পড়া যেতে পারে। যা আবু সালামাহ (রাঃ)-এর জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পাঠ করেছিলেন,

اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي الْمَهْدِيِّيْنَ وَاخْلُفْهُ فِيْ عَقِبِهِ فِي الْغَابِرِيْنَ وَاغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبَّ الْعَالَمِيْنَ، وَافْسَحْ لَهُ فِيْ قَبْرِهِ وَنَوِّرْ لَهُ فِيْهِ-

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগফির লাহু ওয়ারফা‘ দারাজাতাহু ফিল মাহদিইয়ীনা ওয়াখলুফহু ফী ‘আক্বিবিহী ফিল গা-বিরীনা, ওয়াগফির লানা ওয়ালাহু ইয়া রববাল ‘আ-লামীন; ওয়াফসাহ লাহু ফী ক্বাবরিহী ওয়া নাওভির লাহু ফীহি।

অনুবাদ : হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন এবং সুপথপ্রাপ্তদের মধ্যে তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করুন। পিছনে যাদেরকে তিনি ছেড়ে গেলেন, তাদের মধ্যে আপনিই তার প্রতিনিধি হউন। হে বিশ্ব চরাচরের পালনকর্তা! আপনি আমাদেরকে ও তাকে ক্ষমা করুন। আপনি তার জন্য তার কবরকে প্রশস্ত করে দিন এবং সেটিকে তার জন্য আলোকিত করে দিন’। [52]

(৫) এই সময় মৃতের মাগফেরাতের জন্য দো‘আ করা ও তার সদগুণাবলী বর্ণনা করা উচিত। কেননা তাতে ফেরেশতাগণ ‘আমীন’ বলেন ও তার জন্য ওগুলি ওয়াজিব হয়ে যায়’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়’।[53] একটি বর্ণনায় এসেছে যে, ৪, ৩ এমনকি ২ জন নেককার মুমিন ব্যক্তিও যদি মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে উত্তম সাক্ষ্য দেয়, তাতেই তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।[54] অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘কোন মুসলমান মারা গেলে তার নিকটতম প্রতিবেশীদের চারজন যদি তার সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয় যে, তারা তার সম্পর্কে ভাল ব্যতীত কিছুই জানে না, তাহ’লে আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের সাক্ষ্য কবুল করলাম এবং আমি তার ঐসব গোনাহ মাফ করে দিলাম, যেগুলি তোমরা জানো না’। [55] উল্লেখ্য যে, জানাযার সময় মাইয়েত সম্পর্কে উপস্থিত সকলের সমস্বরে ‘ভাল’ বলে সাক্ষ্য দেওয়ার রেওয়াজটি নিন্দনীয় বিদ‘আত।[56]

(৬) দ্রুত কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে এবং মৃতের ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা নিবে, যদি তার সমস্ত মাল দিয়েও হয়। কিছু না থাকলে বা কেউ না থাকলে বা ঋণ মাফ না করলে সমাজ বা রাষ্ট্র তার পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ করবে।[57]


মৃত্যুর পরে বর্জনীয় :

(১) উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার দিয়ে কান্নাকাটি করা।[58]
(২) বাজারে, মিনারে (মাইকে) ‘শোক সংবাদ’ প্রচার করা। [59]
(৩) অতিরঞ্জিত শোক প্রকাশ ও বিলাপধ্বনি করা। মুখ ও বুক চাপড়ানো। মেয়েদের মাথার কাপড় ফেলা ও বুকের কাপড় ছেঁড়া ইত্যাদি।[60] ছাহাবী হোযায়ফা (রাঃ) অছিয়ত করে বলেন, আমি মারা যাওয়ার পরে কাউকে সংবাদ দিয়ো না। আমার ভয় হয় এটা না‘ঈ বা শোক সংবাদ হবে কি-না। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এ থেকে নিষেধ করেছেন’। অন্যান্য ছাহাবী থেকেও এধরনের অছিয়ত বহু রয়েছে। [61] সেকারণ ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, প্রত্যেকের উচিত এভাবে অছিয়ত করে যাওয়া, যেন তার মৃত্যুর পরে কোন প্রকার বিদ‘আত না করা হয়।[62]

(৪) মৃতের জন্য তিনদিন পর্যন্ত শোক প্রকাশের অনুমতি রয়েছে, তার বেশী নয়। [63]
(৫) দাফনে দেরী করা এবং জানাযা করে বা না করে নিকটাত্মীয় আসার অপেক্ষায় লাশ বরফ দিয়ে রেখে দেওয়া সম্পূর্ণরূপে সুন্নাত বিরোধী কাজ।
(৬) মৃত্যুর পরপরই বাড়ীতে এবং জানাযাকালে ও কবরস্থানে ছাদাক্বা বিতরণ করা নাজায়েয। [64]

মৃত্যু পরবর্তী করণীয় সমূহ (الأعمال بعد الموت)

মৃত্যুর পর পাঁচটি কাজ দ্রুত সম্পাদন করতে হয়। যথা গোসল, কাফন, জানাযা, জানাযা বহন ও দাফন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَسْرِعُوا بِالْجِنَازَةِ، فَإِنْ تَكُ صَالِحَةً فَخَيْرٌ تُقَدِّمُوْنَهَا إِلَيْهِ، وَإِنْ يَكُ سِوَى ذَلِكَ فَشَرٌّ تَضَعُوْنَهُ عَنْ رِقَابِكُمْ ‘তোমরা জানাযা করে দ্রুত লাশ দাফন কর। কেননা যদি মৃত ব্যক্তি পুণ্যবান হয়, তবে তোমরা ‘ভাল’-কে দ্রুত কবরে সমর্পণ কর। আর যদি অন্যরূপ হয়, তাহ’লে ‘মন্দ’-কে দ্রুত তোমাদের কাঁধ থেকে নামিয়ে দাও’। [65]

(১) মাইয়েতের গোসল (غسل الميت) :

(ক) গোসল ও কাফন-দাফনের ছওয়াব : উক্ত কাজ সমূহে অশেষ ছওয়াব রয়েছে দু’টি শর্তে। এক- যদি তিনি স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করেন এবং বিনিময়ে দুনিয়াবী কিছুই গ্রহণ না করেন’ (কাহফ ১৮/১১০)। দুই- যদি তিনি মাইয়েতের কোন অপসন্দীয় বিষয় গোপন রাখেন।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোন মুসলিম মাইয়েতকে গোসল করালো। অতঃপর তার গোপনীয়তাসমূহ গোপন রাখলো, আল্লাহ তাকে চল্লিশ বার ক্ষমা করবেন। যে ব্যক্তি মাইয়েতের জন্য কবর খনন করল, অতঃপর দাফন শেষে তা ঢেকে দিল, আল্লাহ তাকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত পুরস্কার দিবেন জান্নাতের একটি বাড়ীর সমপরিমাণ, যেখানে আল্লাহ তাকে রাখবেন। যে ব্যক্তি মাইয়েতকে কাফন পরাবে, আল্লাহ তাকে ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতের মিহি ও মোটা রেশমের পোষাক পরাবেন’। [66]

(খ) হুকুম: মাইয়েতের দ্রুত গোসল ও কাফন-দাফনের ব্যবস্থা নেওয়া সুন্নাত।[67] গোসলের সময় পর্দার ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং পূর্ণ শালীনতা ও পরহেযগারীর সাথে কুলপাতা দেওয়া পানি বা সুগন্ধি সাবান দিয়ে সুন্দরভাবে গোসল করাবে। সুন্নাতী তরীকা মোতাবেক গোসল করাতে সক্ষম এমন নিকটাত্মীয় বা অন্য কেউ মাইয়েতকে গোসল করাবেন। পুরুষ পুরুষকে ও মহিলা মহিলা মাইয়েতকে গোসল দিবেন। তবে মহিলাগণ শিশুকে গোসল দিতে পারবেন। [68] স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীকে বিনা দ্বিধায় গোসল করাবেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় স্ত্রী আয়েশা (রাঃ)-কে বলেছিলেন, ‘যদি আমার পূর্বে তুমি মারা যাও, তাহ’লে আমি তোমাকে গোসল দেব, কাফন পরাব, জানাযা পড়াব ও দাফন করব’। [69] হযরত আবুবকর (রাঃ)-কে তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস (রাঃ) এবং হযরত ফাতেমা (রাঃ)-কে তাঁর স্বামী হযরত আলী (রাঃ) গোসল দিয়েছিলেন।[70] ধর্মযুদ্ধে নিহত শহীদকে গোসল দিতে হয় না। [71] পানি না পাওয়া গেলে মাইয়েতকে তায়াম্মুম করাবে’।[72]

(গ) গোসলের পদ্ধতি : ‘বিসমিল্লাহ’ বলে ডান দিক থেকে ওযূর অঙ্গ সমূহ প্রথমে ধৌত করবে। ধোয়ানোর সময় হাতে ভিজা ন্যাকড়া রাখবে। পূর্ণ পর্দার সাথে মাইয়েতের দেহ থেকে পরনের কাপড় খুলে নেবে। গোসলের সময় লজ্জাস্থানের দিকে তাকাবে না বা খালি হাতে স্পর্শ করবে না। তিনবার বা তিনের অধিক বেজোড় সংখ্যায় সমস্ত দেহে পানি ঢালবে। গোসল শেষে কর্পূর বা কোন সুগন্ধি লাগাবে। মাইয়েত মহিলা হ’লে চুল খুলে দেবে। অতঃপর বেণী করে তিনটি ভাগে পিছন দিকে ছড়িয়ে দেবে। [73]

(২) কাফন (التكفين) :

সাদা, সুতী ও সাধারণ মানের পরিষ্কার কাপড় দিয়ে কাফন দিবে। মাইয়েতের নিজস্ব সম্পদ থেকে কাফন দেওয়া কর্তব্য। তার ব্যবহৃত কাপড় দিয়েও কাফন দেওয়া যাবে। কেননা জীবিত মানুষ নতুন কাপড়ের অধিক মুখাপেক্ষী। পুরুষ ও মহিলা সকল মাইয়েতের জন্য তিনটি কাপড় দিয়ে কাফন দিবে। একটি মাথা হ’তে পা ঢাকার মত বড় চাদর ও দু’টি ছোট কাপড়। অর্থাৎ একটি লেফাফা বা বড় চাদর। একটি তহবন্দ বা লুঙ্গী ও একটি ক্বামীছ বা জামা। বাধ্যগত অবস্থায় একটি কাপড় দিয়ে কিংবা যতটুকু সম্ভব ততটুকু দিয়েই কাফন দিবে। শহীদকে তার পরিহিত পোষাকে এবং মুহরিমকে তার ইহরামের দু’টি কাপড়েই কাফন দিবে। কাফনের কাপড়ের অভাব ঘটলে এক কাফনে একাধিক মাইয়েতকে কাফন দেওয়া যাবে। কাফনের পরে তিনবার সুগন্ধি ছিটাবে। তবে মুহরিমের কাফনে সুগন্ধি ছিটানো যাবে না।[74] মাইয়েতের নিজস্ব সম্পদ না থাকলে কিংবা তাতে কাফনের ব্যবস্থা না হ’লে কেউ দান করবে অথবা বায়তুল মাল থেকে বা সরকারী তহবিল থেকে তার ব্যবস্থা করতে হবে।[75] মহিলাদের জন্য প্রচলিত পাঁচটি কাপড়ের হাদীছ ‘যঈফ’। [76]

(৩) জানাযা (الجنازة) :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর মসজিদের বাইরের নির্দিষ্ট স্থানে অধিকাংশ সময় জানাযা পড়াতেন।[77] তবে প্রয়োজনে মসজিদেও জায়েয আছে। সুহায়েল বিন বায়যা (রাঃ) ও তার ভাইয়ের জানাযা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মসজিদের মধ্যে পড়েছিলেন।[78] হযরত আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-এর জানাযা মসজিদের মধ্যে হয়েছিল। [79] মেয়েরাও পর্দার মধ্যে জানাযায় শরীক হ’তে পারেন। আয়েশা (রাঃ) ও অন্যান্য উম্মাহাতুল মুমিনীন (রাঃ) মসজিদে নববীর মধ্যে সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ)-এর লাশ আনিয়ে নিজেরা জানাযা পড়েছিলেন।[80] মহিলাগণ একাকী বা জামা‘আত সহকারে জানাযা পড়তে পারেন। গোরস্থানের মধ্যে জানাযা না করা উচিত।[81] সেখানে কোন মসজিদও নির্মাণ করা যাবে না।[82] তবে কেউ জানাযা না পেলে পরে যেকোন দিন গিয়ে কবরে একাকী বা জামা‘আত সহকারে জানাযা পড়তে পারেন।[83] উল্লেখ্য যে, লাশ পচে গেলে এবং দুর্গন্ধে কাছে দাঁড়ানো সম্ভব না হ’লে দাফন করার পরে কবরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে জানাযা পড়া যাবে।[84] একই ব্যক্তি বিশেষ কারণে একাধিক বার জানাযার ছালাত আদায় করতে পারেন বা ইমামতি করতে পারেন।[85]

জ্ঞাতব্য : (ক) বর্তমান যুগে অনেকে দাফনের পরপরই পুনরায় হাত তুলে দলবদ্ধভাবে দো‘আ করেন। কেউ একই দিনে বা দু’একদিন পরে আত্মীয়-স্বজন ডেকে এনে মৃতের বাড়ীতে দো‘আর অনুষ্ঠান করেন। এগুলি নিঃসন্দেহে বিদ‘আত। জানা আবশ্যক যে, জানাযার ছালাতই হ’ল মৃতের জন্য একমাত্র দো‘আর অনুষ্ঠান। এটা ব্যতীত মুসলিম মাইয়েতের জন্য পৃথক কোন দো‘আর অনুষ্ঠান ইসলামী শরী‘আতে নেই।

(খ) জানাযার পরে বা দাফনের পূর্বে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সম্মানের নামে করুণ সুরে বিউগল বাজানো সহ যা কিছু করা হয়, সবটাই বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে মৃতের উপর বিলাপধ্বনি করা হয়, কবরে ও ক্বিয়ামতের দিন এজন্য তাকে আযাব দেওয়া হবে’।[86] আর এটা নিঃসন্দেহে ঐ মাইয়েতের জন্য, যে এসব কাজ সমর্থন করে এবং এসব না করার জন্য মৃত্যুর আগে অছিয়ত না করে যায়।[87]

(৪) জানাযা বহন (حمل الجنازة) :

জানাযা কাঁধে বহন করা সুন্নাত।[88] এ সময় মাথা সম্মুখ দিকে রাখবে। [89] মৃতের পরিবারের লোকেরা ও নিকটাত্মীয়গণ এর প্রথম হকদার। এ দায়িত্ব কেবল পুরুষদের, মেয়েদের নয়। জানাযার পিছে পিছে মেয়েদের যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে এটা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ নয়। এই সময় সরবে কান্নাকাটি করা যাবে না। ধূপ-ধুনা ইত্যাদি অগ্নিযুক্ত সুগন্ধি বহন করা যাবে না। সরবে যিকর, তাকবীর ও তেলাওয়াত বা অনর্থক কথাবার্তা বলা যাবে না। বরং মৃত্যুর চিন্তা করতে করতে চুপচাপ ভাবগম্ভীরভাবে মধ্যম গতিতে মাইয়েতের পিছে পিছে কবরের দিকে এগিয়ে যাবে। চলা অবস্থায় রাস্তায় (বিনা প্রয়োজনে) বসা যাবে না।[90] মাইয়েতের পিছনে কাছাকাছি চলাই উত্তম। তবে প্রয়োজনে সম্মুখে ও ডাইনে-বামে চলা যাবে। কেউ গাড়ীতে গেলে তাকে পিছে পিছেই যেতে হবে।[91] কোন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি বা মুরববী আলেম জানাযায় যোগদানে সক্ষম না হ’লে মাইয়েতকে তাঁর সামনে এনে রাখা যাবে। যাতে তিনি একাকী হ’লেও জানাযা পড়তে পারেন। যারা জানাযার পিছনে চলবেন, তাদের ওযূ অবস্থায় থাকা মুস্তাহাব। তবে আবশ্যিক নয়।

বর্তমান যুগে কোন কোন স্থানে জানাযার জন্য গাড়ীতে করে লাশ বহন করতে দেখা যায়। এটি সুন্নাত বিরোধী কাজ। নিতান্ত বাধ্য না হ’লে একাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। কেননা এটা ইহুদী-নাছারাদের অনুকরণ মাত্র। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, عُوْدُوا الْمَرِيْضَ وَاتَّبِعُوا الْجَنَائِزَ تُذَكِّرْكُمُ الْآخِرَةَ– ‘তোমরা রোগীর সেবা কর এবং জানাযার অনুগমন কর। তা তোমাদের আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেবে’।[92] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, জানাযার সাথে ফেরেশতাগণ পায়ে হেঁটে চলেন এবং জানাযা শেষে তারা চলে যান। একারণে আমি বাহনে সওয়ার হইনি। এখন তাঁরা চলে গেছেন বিধায় সওয়ার হ’লাম’। [93]


(৫) দাফন (التدفين) :

মুসলিম মাইয়েতকে মুসলিম কবরস্থানে দাফন করতে হবে, ইহুদী-নাছারা ও কাফের-মুশরিকদের সাথে নয়। যাতে তারা মুসলিম যিয়ারতকারীদের দো‘আ লাভে উপকৃত হন। শিরক ও বিদ‘আতপন্থী ব্যক্তির পাশে ছহীহ হাদীছপন্থী মুসলমানের কবর দেওয়া উচিত নয়। হযরত জাবের (রাঃ) তাঁর পিতার লাশ অন্য মুসলিমের পাশ থেকে যাকে তিনি অপসন্দ করতেন, ৬ মাস পরে উঠিয়ে অন্যত্র দাফন করেছিলেন।[94] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে তাঁর শয়ন কক্ষে দাফন করা হয়েছিল। এটা ছিল তাঁর জন্য ‘খাছ’। তাছাড়া তাঁর পাশে তাঁর দুই মহান সাথীকে কবর দেওয়া হয়েছিল, যাতে কেউ পৃথকভাবে তাঁর কবরকে সিজদার স্থানে পরিণত করতে না পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানগণ যেখানে শহীদ হবেন, সেখানেই কবরস্থ হবেন।[95] মুসলমান যেখানে মৃত্যুবরণ করেন, সেখানকার মুসলিম কবরস্থানে তাকে দাফন করা উচিত। তবে সঙ্গত কারণে অন্যত্র নেওয়া যাবে।[96]

কবর উত্তর-দক্ষিণে লম্বা, গভীর, প্রশস্ত, সুন্দর ও মধ্যস্থলে বিঘত খানেক উঁচু করে দু’দিকে ঢালু হওয়া বাঞ্ছনীয়। অধিক উঁচু করা নাজায়েয। ‘লাহদ’ ও ‘শাক্ব’ দু’ধরনের কবর জায়েয আছে। যাকে এদেশে যথাক্রমে ‘পাশখুলি’ ও ‘বাক্স কবর’ বলা হয়। তবে ‘লাহদ’ উত্তম। মাইয়েতকে কবরে নামানোর দায়িত্ব পুরুষদের। মাইয়েতের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে নিকটবর্তীগণ ও সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তিগণ এই দায়িত্ব পালন করবেন, যিনি পূর্বরাতে (বা দাফনের পূর্বে) স্ত্রী সহবাস করেননি। পায়ের দিক দিয়ে মোর্দা কবরে নামাবে (অসুবিধা হ’লে যেভাবে সুবিধা সেভাবে নামাবে)। মোর্দাকে ডান কাতে ক্বিবলামুখী করে শোয়াবে। এই সময় কাফনের কাপড়ের গিরাগুলি খুলে দেবে। [97]

কবরে শোয়ানোর সময় بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ ‘বিসমিল্লা-হি ওয়া ‘আলা মিল্লাতে রাসূলিল্লা-হ’ (অর্থ: ‘আল্লাহর নামে ও আল্লাহর রাসূলের দ্বীনের উপরে’) বলবে। ‘মিল্লাতে’-এর স্থলে ‘সুন্নাতে’ বলা যাবে। এই সময় কোন সুগন্ধি বা গোলাপ পানি ছিটানো বিদ‘আত। [98] কবর বন্ধ করার পরে উপস্থিত সকলে (বিসমিল্লাহ বলে) তিন মুঠি করে মাটি কবরের মাথার দিক থেকে পায়ের দিকে ছড়িয়ে দেবে।[99] এ সময় ‘মিনহা খালাক্বনা-কুম ওয়া ফীহা নু‘ঈদুকুম ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তা-রাতান উখরা’ (ত্বোয়াহা ২০/৫৫) পড়ার কোন ছহীহ দলীল নেই। [100] অনুরূপভাবে আল্লা-হুম্মা আজিরহা মিনাশ শায়ত্বা-নি ওয়া মিন ‘আযা-বিল ক্বাবরে… পড়ার কোন ছহীহ ভিত্তি নেই।[101]

দাফন চলাকালীন সময়ে কবরের নিকটে বসে কবর আযাব, জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন ও জান্নাতের সুসংবাদের উপরে কুরআন ও ছহীহ হাদীছ থেকে আলোচনা করবে। এই সময় প্রত্যেকে দু’তিনবার করে পড়বে- اَللَّهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ‘ঊযুবিকা মিন ‘আযা-বিল ক্বাবরি’ (হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকটে কবরের আযাব হ’তে পানাহ চাই)।[102]

দাফনের পরে মাইয়েতের ‘তাছবীত’ (التثبيت) অর্থাৎ মুনকার ও নাকীর (দু’জন অপরিচিত ফেরেশতা)-এর সওয়ালের জওয়াব দানের সময় যেন তিনি দৃঢ় থাকতে পারেন, সেজন্য ব্যক্তিগতভাবে সকলের দো‘আ করা উচিত। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, إِسْتَغْفِرُوْا لِأَخِيْكُمْ وَسَلُوا اللهَ لَهُ التَّثْبِيْتَ فَإِنَّهُ اَلْآنَ يُسْأَلُ ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার দৃঢ় থাকার জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ কর। কেননা সত্বর সে জিজ্ঞাসিত হবে’। [103] অতএব এ সময় প্রত্যেকের নিম্নোক্ত ভাবে দো‘আ করা উচিত। যেমন,

(১) اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَثَبِّتْهُ ‘আল্লা-হুম্মাগফির লাহূ ওয়া ছাবিবতহু’ (অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন ও তাকে দৃঢ় রাখুন’)।[104] অথবা
(২) اَللَّهُمَّ ثَبِّتْهُ بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ ‘আল্লা-হুম্মা ছাবিবতহু বিল ক্বাউলিছ ছা-বিত’ (হে আল্লাহ! আপনি তাকে কালেমা শাহাদাত দ্বারা সুদৃঢ় রাখুন)। এই সময় ঐ ব্যক্তি দো‘আর ভিখারী। আর জীবিত মুমিনের দো‘আ মৃত মুমিনের জন্য খুবই উপকারী। এই সময় মাইয়েতের তালক্বীনের উদ্দেশ্যে সকলের লা ইলাহা ইল্লাল্লা-হ পাঠের কোন দলীল নেই। যেটা শাফেঈ মাযহাবে ব্যাপকভাবে চালু আছে।[105]

(৩) পূর্বে বর্ণিত জানাযার ২ নং দো‘আটি এবং ৩ নং দো‘আটির শেষাংশটুকুও اَللَّهُمَّ اغْفِرْلَهُ وَارْحَمْهُ، إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُوْرالرَّحِيْمُ (আল্লা-হুম্মাগফিরলাহূ ওয়ারহামহু, ইন্নাকা আন্তাল গাফূরুর রহীম) পড়া যায়। কিন্তু দাফনের পরে একজনের নেতৃত্বে সকলে সম্মিলিতভাবে হাত উঠিয়ে দো‘আ করা ও সকলের সমস্বরে ‘আমীন’ ‘আমীন’ বলার প্রচলিত প্রথার কোন ভিত্তি নেই।

কবরে নিষিদ্ধ কর্ম সমূহ (المنهيات على القبور) :

(১) কবর এক বিঘতের বেশী উঁচু করা, পাকা ও চুনকাম করা, সমাধি সৌধ নির্মাণ করা, গায়ে নাম লেখা, কবরের উপরে বসা, কবরের দিকে ফিরে ছালাত আদায় করা। [106]

(২) ধুয়ে-মুছে সুন্দর করা, কবরে মসজিদ নির্মাণ করা, সেখানে মেলা বসানো, ওরস করা ও কবরকে তীর্থস্থানে পরিণত করা।[107]

(৩) কবরের নিকটে গরু-ছাগল-মোরগ ইত্যাদি যবেহ করা। জাহেলী যুগে দানশীল ও নেককার ব্যক্তিদের কবরের পাশে এগুলি করা হ’ত।[108]

(৪) কবরে ফুল দেওয়া, গেলাফ চড়ানো, শামিয়ানা টাঙ্গানো ইত্যাদি।[109] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আল্লাহ আমাদেরকে ইট, পাথর ও মাটি ইত্যাদিকে কাপড় পরিধান করাতে নির্দেশ দেননি’।[110] এগুলি স্পষ্টভাবে কবরপূজার শামিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন,

عَنْ أَبِى الْهَيَّاجِ الأَسَدِىِّ قَالَ قَالَ لِى عَلِىُّ بْنُ أَبِى طَالِبٍ: أَلاَّ أَبْعَثُكَ عَلَى مَا بَعَثَنِى عَلَيْهِ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: أَنْ لاَ تَدَعَ تِمْثَالاً إِلاَّ طَمَسْتَهُ وَلاَ قَبْرًا مُشْرِفًا إِلاَّ سَوَّيْتَهُ-

‘তুমি কোন মূর্তিকে ছেড় না নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত এবং কোন উঁচু কবরকে ছেড় না মাটি সমান না করা পর্যন্ত’। [111]
(ক) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রার্থনা করেছেন, اَللَّهُمَّ لاَ تَجْعَلْ قَبْرِي وَثَناً يُّعْبَدُ اشْتَدَّ غَضَبُ اللهِ عَلَى قَوْمٍ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার কবরকে ইবাদতের স্থানে পরিণত করো না। আল্লাহর গযব কঠোরতর হয় ঐ

জাতির উপরে, যারা তাদের নবীর কবরকে সিজদার স্থানে পরিণত করে।[112]

(খ) আজকাল কবরকে ‘মাযার’ বলা হচ্ছে। যার অর্থ: পবিত্র সফরের স্থান। অথচ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলে গেছেন, ‘(নেকী হাছিলের উদ্দেশ্যে) তিনটি স্থান ব্যতীত সফর করা যাবে না, মাসজিদুল হারাম, মাসজিদুল আক্বছা ও আমার এই মসজিদ’।[113] তিনি তাঁর উম্মতের উদ্দেশ্যে বলেন,لاَ تَجْعَلُوْا قَبْرِىْ عِيْدًا ‘তোমরা আমার কবরকে তীর্থস্থানে পরিণত করো না’।[114]

(গ) মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্বে তিনি উম্মতকে সাবধান করে বলেন, لاَ تَتَّخِذُوا الْقُبُوْرَ مَسَاجِدَ، إِنِّيْ أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ– ‘সাবধান! তোমরা কবর সমূহকে সিজদার স্থানে পরিণত করো না। আমি তোমাদেরকে এ ব্যাপারে নিষেধ করে যাচ্ছি’।[115]

(ঘ) কবরে মসজিদ নির্মাণকারী ও সেখানে মৃতব্যক্তির ছবি, মূর্তি ও প্রতিকৃতি স্থাপনকারীদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‘এরা ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকটে নিকৃষ্টতম সৃষ্টি হিসাবে গণ্য হবে’। [116]

(ঙ) কবরের বদলে কোন গৃহে বা রাস্তার ধারে বা কোন বিশেষ স্থানে মৃতের পূর্ণদেহী বা আবক্ষ প্রতিকৃতি নির্মাণ করে বা স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন করে সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা ও নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা পরিষ্কারভাবে মূর্তিপূজার শামিল। যা স্পষ্ট শিরক এবং যা থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।

উল্লেখ্য যে, মাথাসহ আবক্ষ ছবি ও মূর্তি পুরা মূর্তির শামিল, যা সর্বদা নিষিদ্ধ।[117]

কবরে প্রচলিত শিরক সমূহ (الشركيات المروجة على القبور)

(১) কবরে সিজদা করা
(২) সেদিকে ফিরে ছালাত আদায় করা
(৩) সেখানে বসা ও আল্লাহর কাছে সুফারিশের জন্য তার নিকট প্রার্থনা করা
(৪) সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা
(৫) কবরবাসীর নিকটে কিছু কামনা করা
(৬) তার অসীলায় মুক্তি প্রার্থনা করা
(৭) তাকে খুশী করার জন্য কবরে নযর-নেয়ায ও টাকা-পয়সা দেওয়া
(৮) সেখানে মানত করা
(৯) ছাগল-মোরগ ইত্যাদি হাজত দেওয়া
(১০) সেখানে বার্ষিক ওরস ইত্যাদি করা
(১১) মাযারে নযর-নেয়ায না দিলে মৃত পীরের বদ দো‘আয় ধ্বংস হয়ে যাবে, এই ধারণা পোষণ করা (১২) সেখানে নযর-মানত করলে পরীক্ষায় বা মামলায় বা কোন বিপদে মুক্তি পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস করা
(১৩) খুশীর কোন কাজে মৃত পীরের মাযারে শুকরিয়া স্বরূপ টাকা-পয়সা না দিলে পীরের বদ দো‘আ লাগবে, এমন ধারণা করা
(১৪) নদী ও সাগরের মালিকানা খিযির (আঃ)-এর মনে করে তাকে খুশী করার জন্য সাগরে বা নদীতে হাদিয়া স্বরূপ টাকা-পয়সা নিক্ষেপ করা
(১৫) মৃত পীরের পোষা কুমীর, কচ্ছপ, গজাল মাছ, কবুতর ইত্যাদিকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ ও ক্ষমতাশালী মনে করা
(১৬) এই বিশ্বাস রাখা যে, মৃত পীর কবরে জীবিত আছেন ও ভক্তদের ভাল-মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন (১৭) তিনি ভক্তের ডাক শোনেন এবং তার জন্য আল্লাহর নিকট সুফারিশ করেন
(১৮) বিপদে কবরস্থ পীরকে ডাকা ও তার কবরে গিয়ে কান্নাকাটি করা
(১৯) খুশীতে ও নাখুশীতে পীরের কবরে পয়সা দেওয়া
(২০) কবরস্থ ব্যক্তি খুশী হবেন ভেবে তার কবরে সৌধ নির্মাণ করা, তার সৌন্দর্য বর্ধন করা ও সেখানে সর্বদা আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করা
(২১) কবর আযাব মাফ হবে মনে করে পীরের কবরের কাছাকাছি কবরস্থ হওয়া
(২২) কবরস্থানের পাশ দিয়ে কোন মুত্তাক্বী আলেম হেঁটে গেলে ঐ কবরবাসীদের চল্লিশ দিনের গোর আযাব মাফ হয় বলে বিশ্বাস রাখা
(২৩) কবরে বা ছবি ও প্রতিকৃতিতে বা স্মৃতিসৌধে বা বিশেষ কোন স্থানে ফুলের মালা দিয়ে বা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নীরবতা পালনের মাধ্যমে বা স্যালুট জানিয়ে মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা অথবা একই উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়ে মীলাদ ও কুরআনখানী করা ইত্যাদি।

জানা আবশ্যক যে, মানুষকে জাহান্নামে নেওয়ার জন্য শয়তান সর্বদা পিছনে লেগে থাকে। এজন্য সে অনেক সময় নিজেই মানুষের রূপ ধারণ করে অথবা অন্য মানুষের মাধ্যমে তার উদ্দেশ্য হাছিল করে। যেমন হঠাৎ করে শুনা যায় অমুক স্থানে স্বপ্নে পাওয়া শিকড়ে বা তাবীযে মানুষের সব রোগ ভাল হয়ে যাচ্ছে। অমুক দুধের বাচ্চা কিংবা পুরুষ বা মহিলার ফুঁক দানের মাধ্যমে দুরারোগ্য ব্যাধি ভাল হয়ে যাচ্ছে। এমনকি পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে চোখের সামনে চিকিৎসা শেষে তখনই সুস্থ হয়ে রোগী বাড়ী ফিরছে। অতঃপর দু’পাঁচ মাস দৈনিক লাখো মানুষের ভিড় জমিয়ে মানুষের ঈমান হরণ করে কথিত ঐ অলৌকিক চিকিৎসক হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। এগুলি সবই শয়তানী কারসাজি। সাময়িকভাবে এরূপ করার ক্ষমতা আল্লাহ ইবলীসকে দিয়েছেন।[118] তবে জীবিত শয়তানের ধোঁকার জাল ছিন্ন হ’লেও মৃত পীর পূজার শয়তানী ধোঁকার জাল বিস্তৃত থাকে যুগের পর যুগ ধরে। যেখান থেকে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই কেবল কদাচিৎ বেরিয়ে আসতে পারেন।

আল্লাহ বলেন, يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيهِمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلاَّ غُرُوْرًا ‘শয়তান তাদের মিথ্যা ওয়াদা দেয় ও আশার বাণী শুনায়। অথচ শয়তান তাদেরকে প্রতারণা ব্যতীত কোনই প্রতিশ্রুতি দেয় না’ (নিসা ৪/১২০)। কিন্তু শত প্রতারণার জাল বিছিয়েও শয়তান আল্লাহর কোন মুখলেছ বান্দাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না (হিজর ১৫/৪০)।

পৃথিবীর প্রাচীনতম শিরক হ’ল মৃত মানুষের পূজা। যা নূহ (আঃ)-এর যুগে শুরু হয়। অথচ তাওহীদের মূল শিক্ষা ছিল মানুষকে মানুষের পূজা হ’তে মুক্ত করে সরাসরি আল্লাহর দাসত্বের অধীনে স্বাধীন মানুষে পরিণত করা। কিন্তু মৃত সৎ লোকের অসীলায় আল্লাহর নৈকট্য হাছিল করা ও পরকালে জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচার ভিত্তিহীন ধারণার উপর ভর করে শয়তানের কুমন্ত্রণায় নূহ (আঃ)-এর সমাজে প্রথম শিরকের সূচনা হয়। যা মুর্তিপূজা, কবরপূজা, স্থানপূজা, ছবি ও প্রতিকৃতি পূজা ইত্যাদি আকারে যুগে যুগে মানব সমাজে চালু রয়েছে।

আল্লাহ বলেন, إِنْ يَدْعُوْنَ مِنْ دُونِهِ إِلاَّ إِنَاثًا وَإِنْ يَدْعُوْنَ إِلاَّ شَيْطَانًا مَرِيْدًا ‘আল্লাহকে ছেড়ে এরা নারীদের আহবান করে। বরং এরা বিদ্রোহী শয়তানকে আহবান করে’ (নিসা ৪/১১৭)। উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) বলেন, مَعَ كُلِّ صَنَمٍ جِنِّيَّةٌ ‘প্রত্যেক মূর্তির সাথে একজন করে নারী জিন থাকে’।[119] মক্কা বিজয়ের পরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশে খালেদ ইবনু ওয়ালীদ বিখ্যাত ‘উয্যা’ মূর্তি ধ্বংস করার সময় সেখান থেকে বেরিয়ে আসা ঘোর কৃষ্ণবর্ণ বিক্ষিপ্ত চুল বিশিষ্ট একটা নগ্ন নারী জিনকে দ্বিখন্ডিত করেন। [120] এরা অলক্ষ্যে থেকে মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে এবং তাদেরকে মূর্তিপূজা, কবরপূজা, স্থানপূজা ও সৃষ্টি পূজার প্রতি প্রলুব্ধ করে। অথচ এই শিরক থেকে তওবা না করার কারণেই নূহ (আঃ)-এর কওমকে আল্লাহ সমূলে ধ্বংস করেছিলেন। এ যুগেও যদি আমরা এই মহাপাপ থেকে তওবা না করি, তাহ’লে আমরাও আল্লাহর গযবে ধ্বংস হয়ে যাব। আল্লাহ বলেন,

أَلَمْ يَرَوْا كَمْ أَهْلَكْنَا قَبْلَهُمْ مِنَ الْقُرُوْنِ أَنَّهُمْ إِلَيْهِمْ لاَ يَرْجِعُوْنَ- وَإِنْ كُلٌّ لَّمَّا جَمِيْعٌ لَّدَيْنَا مُحْضَرُوْنَ- (يـس 31-32)-

‘তারা কি দেখে না যে, তাদের পূর্বের কত সম্প্রদায়কে আমরা ধ্বংস করেছি, যারা তাদের নিকটে আর ফিরে আসবে না’। ‘আর অবশ্যই তাদের সকলকে আমাদের নিকট উপস্থিত করা হবে’ (ইয়াসীন ৩৬/৩১-৩২)। অন্যত্র তিনি বলেন,

إِنَّهُ مَنْ يُّشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِيْنَ مِنْ أَنْصَارٍ- (المائدة 72)-

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করল, আল্লাহ তার উপরে জান্নাতকে হারাম করে দেন এবং তার ঠিকানা হ’ল জাহান্নাম। আর সেখানে মুশরিকদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না’ (মায়েদাহ ৫/৭২)। তিনি আরও বলেন, إِنَّ اللهَ لاَ يَغْفِرُ أَنْ يُّشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَّشَآءُ- (النساء 48، 116)- ‘আল্লাহ কখনোই শিরকের গোনাহ মাফ করেন না। এতদ্ব্যতীত বান্দার যেকোন গোনাহ তিনি মাফ করে থাকেন, যাকে তিনি ইচ্ছা করেন’ (নিসা ৪/৪৮, ১১৬)।

মৃত্যুর পরে প্রচলিত বিদ‘আত সমূহ (البدع المروجة بعد الموت)

(১) মৃত্যুর আগে বা পরে মাইয়েতকে ক্বিবলার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া
(২) মাইয়েতের শিয়রে বসে সূরা ইয়াসীন বা কুরআন তেলাওয়াত করা (তালখীছ ৯৬, ৯৭)।
(৩) মাইয়েতের নখ কাটা ও গুপ্তাঙ্গের লোম ছাফ করা (৯৭)
(৪) কাঠি দিয়ে (বা নির্দিষ্ট সংখ্যক নিম কাঠি দিয়ে) দাঁত খিলাল করানো
(৫) নাক-কান-গুপ্তাঙ্গ প্রভৃতি স্থানে তুলা ভরা (৯৭)
(৬) দাফন না করা পর্যন্ত পরিবারের লোকদের না খেয়ে থাকা (৯৭)
(৭) বাড়ীতে বা কবরস্থানে এই সময় ছাদাক্বা বিলি করা (৯৯, ১০৩) 
(৮) চীৎকার দিয়ে কান্নাকাটি করা, বুক চাপড়ানো, কাপড় ছেঁড়া, মাথা ন্যাড়া করা, দাড়ি-গোঁফ না মুন্ডানো ইত্যাদি (১৮, ৯৭)
(৯) তিন দিনের অধিক (সপ্তাহ, মাস, ছয় মাস ব্যাপী) শোক পালন করা (১৫, ৭৩) কেবল স্ত্রী ব্যতীত। কেননা তিনি ৪ মাস ১০ দিন ইদ্দত পালন করবেন
(১০) কাফির, মুশরিক, মুনাফিকদের জন্য দো‘আ করা (৪৮)
(১১) শোক দিবস (শোকের মাস ইত্যাদি) পালন করা, শোকসভা করা ও এজন্য খানাপিনার বা (কাঙ্গালী ভোজের) আয়োজন করা ইত্যাদি (৭৩-৭৪)
(১২) মসজিদের মিনারে বা বাজারে মাইকে অলি-গলিতে ‘শোক সংবাদ’ প্রচার করা (১৯, ৯৮)
(১৩) কবরের উপরে খাদ্য ও পানীয় রেখে দেওয়া। যাতে লোকেরা তা নিয়ে যায় (১০৩)
(১৪) মৃতের কক্ষে তিন রাত, সাত রাত (বা ৪০ রাত) ব্যাপী আলো জ্বেলে রাখা (৯৮)
(১৫) কাফনের কাপড়ের উপরে কুরআনের আয়াত ও দো‘আ-কালেমা ইত্যাদি লেখা (৯৯)
(১৬) এই ধারণা করা যে, মাইয়েত জান্নাতী হ’লে ওযনে হালকা হয় ও দ্রুত কবরের দিকে যেতে চায় (৯৯)
(১৭) মাইয়েতকে দূরবর্তী নেককার লোকদের গোরস্থানে নিয়ে দাফন করা (৯৯)
(১৮) জানাযার পিছে পিছে উচ্চৈঃস্বরে যিকর ও তেলাওয়াত করতে থাকা (১০০)
(১৯) জানাযা শুরুর প্রাক্কালে মাইয়েত কেমন ছিলেন বলে লোকদের কাছ থেকে সমস্বরে সাক্ষ্য নেওয়া (১০১)
(২০) জানাযার ছালাতের আগে বা দাফনের পরে তার শোকগাথা বর্ণনা করা (১০০)
(২১) জুতা পাক থাকা সত্ত্বেও জানাযার ছালাতে জুতা খুলে দাঁড়ানো (১০১)।
(২২) কবরে মাইয়েতের উপরে গোলাপ পানি ছিটানো (১০২)
(২৩) কবরের উপরে মাথার দিক থেকে পায়ের দিকে ও পায়ের দিক থেকে মাথার দিকে পানি ছিটানো। অতঃপর অবশিষ্ট পানিটুকু কবরের মাঝখানে ঢালা (১০৩)
(২৪) তিন মুঠি মাটি দেওয়ার সময় প্রথম মুঠিতে ‘মিনহা খালাক্বনা-কুম’ দ্বিতীয় মুঠিতে ‘ওয়া ফীহা নু‘ঈদুকুম’ এবং তৃতীয় মুঠিতে ‘ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তা-রাতান উখরা’ বলা (ত্বোয়াহা ৫৫; ১০২) (২৫) অথবা ‘আল্লা-হুম্মা আজিরহা মিনাশ শায়ত্বান’…. পাঠ করা (ইবনু মাজাহ হা/১৫৫৩, ‘যঈফ’)। (২৬) কবরে মাথার দিকে দাঁড়িয়ে সূরায়ে ফাতিহা ও পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে সূরায়ে বাক্বারাহর শুরুর অংশ পড়া (১০২)
(২৭) সূরায়ে ফাতিহা, ক্বদর, কাফেরূণ, নছর, ইখলাছ, ফালাক্ব ও নাস এই সাতটি সূরা পাঠ করে দাফনের সময় বিশেষ দো‘আ পড়া (১০২)
(২৮) কবরের কাছে বসে কুরআন তেলাওয়াত ও খতম করা (১০৪)
(২৯) কবরের উপরে শামিয়ানা টাঙ্গানো (১০৪)
(৩০) নির্দিষ্ট ভাবে প্রতি জুম‘আয় কিংবা সোম ও বৃহস্পতিবারে পিতা-মাতার কবর যেয়ারত করা (১০৫) (৩১) এতদ্ব্যতীত আশূরা, শবে মে‘রাজ, শবেবরাত, রামাযান ও দুই ঈদে বিশেষভাবে কবর যেয়ারত করা (৩২) কবরের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ানো ও সূরায়ে ফাতিহা ১ বার, ইখলাছ ১১ বার কিংবা সূরা ইয়াসীন ১ বার পড়া (১০৫)।
(৩৩) কুরআন পাঠকারীকে উত্তম খানা-পিনা ও টাকা-পয়সা দেওয়া বা এ বিষয়ে অছিয়ত করে যাওয়া (১০৪, ১০৬)
(৩৪) কবরকে সুন্দর করা (১০৭)।
(৩৫) কবরে রুমাল, কাপড় ইত্যাদি বরকত মনে করে নিক্ষেপ করা (১০৮) ।
(৩৬) কবরে চুম্বন করা (১০৮)।
(৩৭) কবরের গায়ে মৃতের নাম ও মৃত্যুর তারিখ লেখা (১০৯)।
(৩৮) কবরের গায়ে বরকত মনে করে হাত লাগানো এবং পেট ও পিঠ ঠেকানো (১০৮)।
(৩৯) ত্রিশ পারা কুরআন (বা সূরা ইয়াসীন) পড়ে এর ছওয়াব সমূহ মৃতের নামে বখশে দেয়া (১০৬)। যাকে এদেশে ‘কুরআনখানী’ বলে।
(৪০) কাফেরূণ, ইখলাছ, ফালাক্ব ও নাস এই চারটি ‘কুল’ সূরার প্রতিটি ১ লক্ষ বার পড়ে মৃতের নামে বখশে দেওয়া, যাকে এদেশে ‘কুলখানী’ বলে।
(৪১) কালেমা ত্বাইয়িবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ১ লক্ষ বার পড়ে মৃতের নামে বখশে দেওয়া, যাকে এদেশে ‘কালেমাখানী’ বলে।
(৪২) ১ম, ৩য়, ৭ম (বা ১০ম দিনে) বা ৪০ দিনে চেহলাম বা চল্লিশার অনুষ্ঠান করা
(৪৩) ‘খানা’র অনুষ্ঠান করা (১০৩)
(৪৪) যারা কবর খনন করে ও দাফনের কাজে সাহায্য করে, তাদেরকে মৃতের বাড়ী দাওয়াত দিয়ে বিশেষ খানার ব্যবস্থা করা। যাকে এদেশে ‘হাত ধোয়া খানা’ বলা হয়
(৪৫) আযান শুনে নেকী পাবে বা গোর আযাব মাফ হবে ভেবে মসজিদের পাশে কবর দেওয়া
(৪৬) কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ‘ফাতিহা’ পাঠ করা (২০)
(৪৭) কাফন-দাফনের কাজকে নেকীর কাজ না ভেবে পয়সার বিনিময়ে কাজ করা
(৪৮) মৃত ব্যক্তির কবরের পাশে আলো জ্বেলে ও মাইক লাগিয়ে রাত্রি ব্যাপী উচ্চৈঃস্বরে কুরআন খতম করা
(৪৯) মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা (১০৪, ১০৬) 
(৫০) ছালাত, ক্বিরাআত ও অন্যান্য দৈহিক ইবাদত সমূহের নেকী মৃতদের জন্য হাদিয়া দেওয়া (১০৬)। যাকে এদেশে ‘ছওয়াব রেসানী’ বলা হয়
(৫১) আমল সমূহের ছওয়াব রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নামে (বা অন্যান্য নেককার মৃত ব্যক্তিদের নামে) বখশে দেওয়া (১০৬)। যাকে এদেশে ‘ঈছালে ছওয়াব’ বলা হয়
(৫২) নেককার লোকদের কবরে গিয়ে দো‘আ করলে তা কবুল হয়, এই ধারণা করা (১০৮)।
(৫৩) মৃত্যুর সাথে সাথে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় বলে ধারণা করা
(৫৪) জানাযার সময় স্ত্রীর নিকট থেকে মোহরানা মাফ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা
(৫৫) ঐ সময় মৃতের ক্বাযা ছালাত সমূহের বা উমরী ক্বাযার কাফফারা স্বরূপ টাকা আদায় করা
(৫৬) মৃত্যুর পরপরই ফকীর-মিসকীনদের মধ্যে চাউল ও টাকা-পয়সা বিতরণ করা
(৫৭) দাফনের পরে কবরস্থানে মহিষ বা গবাদি-পশু যবহ করে গরীবদের মধ্যে গোশত বিতরণ করা (৫৮) লাশ কবরে নিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তায় তিনবার নামানো
(৫৯) কবরে মাথার কাছে ‘মক্কার মাটি’ নামক আরবীতে ‘আল্লাহ’ লেখা মাটির ঢেলা রাখা
(৬০) মাইয়েতের মুখে ও কপালে আতর দিয়ে ‘আল্লাহ’ লেখা
(৬১) কবরে মোমবাতি, আগরবাতি ইত্যাদি দেওয়া
(৬২) পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের সময় বদনায় পানি দিয়ে যাওয়া এই নিয়তে যে, মৃতের রূহ এসে ওযূ করে ছালাত আদায় করে যাবে
(৬৩) মৃতের ঘরে ৪০ দিন যাবৎ বিশেষ লৌহজাত দ্রব্য রাখা
(৬৪) মৃত্যুর ২০দিন পর রুটি বিলি করা ও ৪০ দিন পর বড় ধরনের ‘খানা’র অনুষ্ঠান করা
(৬৫) মৃতের বিছানা ও খাট ইত্যাদি ৭দিন পর্যন্ত একইভাবে রাখা
(৬৬) মৃতের পরকালীন মুক্তির জন্য তার বাড়ীতে মীলাদ বা ওয়ায মাহফিল করা
(৬৭) নববর্ষ, শবেবরাত ইত্যাদিতে কোন বুযর্গ ব্যক্তিকে ডেকে মৃতের কবর যিয়ারত করিয়ে নেওয়া ও তাকে বিশেষ সম্মানী প্রদান করা
(৬৮) শবেবরাতে ঘরবাড়ী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে মৃত স্বামীর রূহের আগমন অপেক্ষায় তার পরিত্যক্ত কক্ষে বা অন্যত্রে সারা রাত জেগে বসে থাকা ও ইবাদত-বন্দেগী করা
(৬৯) ঈছালে ছওয়াবের অনুষ্ঠান করা
(৭০) নিজের কোন একটি বা একাধিক সমস্যা সমাধানের নিয়তে কবরের গায়ে বা পাশের কোন গাছের ডালে বিশেষ ধরনের সুতা বা ইটখন্ড ঝুলিয়ে রাখা।
(৭১) মাযার থেকে ফিরে আসার সময় কবরের দিকে মুখ করে বেরিয়ে আসা
(৭২) মৃত্যুর আগেই কবর তৈরী করা (১০৪)
(৭৩) কবরে মৃত ব্যক্তির ব্যবহৃত বস্ত্ত সমূহ রাখা এই ধারণায় যে, সেগুলি তার কাজে আসবে
(৭৪) কবরে কা‘বা গৃহের কিংবা কোন পীরের কবরের গেলাফের অংশ কিংবা তাবীয লিখে দাফন করা এই ধারণায় যে, এগুলি তাকে কবর আযাব থেকে বাঁচিয়ে দেবে
(৭৫) কবরে ‘ওরস’ উপলক্ষে বা অন্য সময়ে রান্না করা খিচুড়ী বা তৈরী করা রুটি বা মিষ্টি ‘তাবাররুক’ নাম দিয়ে বরকতের খাদ্য মনে করে ভক্ষণ করা
(৭৬) আজমীরে খাজাবাবার কবরে টাকা পাঠানো বা অন্য কোন পীর বাবার কবরে গরু-ছাগল, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য হাদিয়া পাঠানো
(৭৭) কবরের মধ্যবর্তী স্থানে আঙ্গুল প্রবেশ করিয়ে মৃতের জন্য দো‘আ পড়া
(৭৮) কবরের উপরে একটি বা চার কোণে চারটি কাঁচা খেজুরের ডাল পোতা বা কোন গাছ লাগানো এই ধারণা করে যে, এর প্রভাবে কবর আযাব হালকা হবে।
(৭৯) খাটিয়া ও মাইয়েত ঢাকার কাপড় খুব সুন্দর করা (৯৯)
(৮০) কালেমা ও পবিত্র কুরআনের আয়াত লিখিত কালো কাপড় দিয়ে খাটিয়া ঢাকা।
(৮১) মৃতের প্রত্যেক অঙ্গ ধোয়ার সময় পৃথক পৃথক দো‘আ পড়া (৯৮)
(৮২) জানাযা বহনের সাথে সাথে ছাদাক্বা বিতরণ করা এবং লোকদের কোল্ড ড্রিংকস পান করানো (৯৯)
(৮৩) লাশের নিকট ভিড় করা (৯৯)
(৮৪) মৃতের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী বা অন্য কোন উপলক্ষে দিনভর উচ্চৈঃস্বরে তার বক্তৃতা বা কুরআনের ক্যাসেট বাজানো
(৮৫) বিশেষ কোন নেককার ব্যক্তির কবর থাকার কারণে জনপদের লোকেরা রূযিপ্রাপ্ত হয় ও আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত হয় বলে ধারণা পোষণ করা (১০৬)।
(৮৬) জানাযা শুরুর পূর্বে ইমামের পক্ষ থেকে মুছল্লীদের উদ্দেশ্যে উচ্চৈঃস্বরে ‘নিয়ত’ বলে দেওয়া
(৮৭) ইমাম ও মুক্তাদীর ‘ছানা’ পড়া (১০১)।
(৮৮) সূরা ফাতিহা ও একটি সূরা ছাড়াই জানাযার ছালাত আদায় করা (১০১)। 
(৮৯) জানাযা শেষ হবার পরেই সেখানে দাঁড়িয়ে অথবা দাফন শেষে একজনের নেতৃত্বে সকলে দু’হাত তুলে দলবদ্ধভাবে মুনাজাত করা।
(৯০) জানাযার সময়ে সকলকে মৃতের বাড়ীতে কুলখানির অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া।

উপরে বর্ণিত বিষয়গুলি ছাড়াও মৃত ব্যক্তি ও কবরকে কেন্দ্র করে হাযারো রকমের শিরকী আক্বীদা ও বিদ‘আতী রসম-রেওয়াজ উপমহাদেশে মুসলিম সমাজে চালু আছে। অতএব প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য হবে এসকল শিরক ও বিদ‘আতী কর্মকান্ড হ’তে দূরে থাকা। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন।- আমীন!!

জানা আবশ্যক যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দু’টি কবরের উপরে যে খেজুরের দু’টি কাঁচা চেরা ডাল পুঁতেছিলেন, সেটা ছিল তাঁর জন্য ‘খাছ’। তাঁর বা কোন ছাহাবীর পক্ষ থেকে পরবর্তীতে এমন কোন আমল করার নযীর নেই বুরাইদা আসলামী (রাঃ) ব্যতীত। কেননা তিনি এটার জন্য অছিয়ত করেছিলেন (বুখারী)। অতএব এটা স্পষ্ট যে, কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নেক আমলের কারণেই কবর আযাব মাফ হ’তে পারে। ফুল দেওয়া বা কাঁচা ডাল পোতার কারণে নয়। কেননা এসবের কোন প্রভাব মাইয়েতের উপর পড়ে না। যেমন আব্দুর রহমান (রাঃ)-এর কবরের উপর তাঁবু খাটানো দেখে ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, ওটাকে হটিয়ে ফেল হে বৎস! কেননা ওটা তার আমলের উপরে ছায়া করছে বা বাধা সৃষ্টি করছে।[121]

কবরে আলোকসজ্জা করা :

কবরে বাতি দেওয়া নিষেধের হাদীছটি যঈফ।[122] তবে এটি কয়েকটি কারণে নিকৃষ্টতম বিদ‘আত। (১) এটি নবাবিষ্কৃত বিষয়, যা ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল না
(২) এটি অগ্নি উপাসক মজূসীদের অনুকরণ
(৩) এতে স্রেফ মালের অপচয় হয়, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ
(৪) একে আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের মাধ্যম বলে ধারণা করা হয়।[123] যা ভিত্তিহীন ও ইসলাম বিরোধী আক্বীদা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, كُلُّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ وَكُلُّ ضَلاَلَةٍ فِى النَّارِ ‘প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম’। [124] আল্লাহ বলেন,

قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِيْنَ أَعْمَالاً، اَلَّذِيْنَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُوْنَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُوْنَ صُنْعًا-

‘আপনি বলে দিন, আমি কি তোমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারীদের সম্পর্কে খবর দিব? দুনিয়ার জীবনে যাদের সমস্ত আমল বরবাদ হয়েছে। অথচ তারা ভাবে যে, তারা সুন্দর আমল করে যাচ্ছে’ (কাহ্ফ ১৮/১০৩-৪)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ، متفق عليه– ‘যে ব্যক্তি আমাদের শরী‘আতে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’।[125] ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, إِنَّ كُلَّ مَا لَمْ يَكُنْ عَلَى عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَصْحَابِهِ دِيْنًا لَمْ يَكُنِ الْيَوْمَ دِيْنًا– ‘নিশ্চয়ই যে সকল বস্ত্ত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীগণের সময়ে দ্বীন হিসাবে গণ্য ছিল না, এ যুগে তা দ্বীন হিসাবে গণ্য হবে না’।[126]

জানাযা বিষয়ে অন্যান্য জ্ঞাতব্য সমূহ (معلومات أخرى فى الجنازة)

(১) কবর ও লাশ বিষয়ে (فى القبر والميت) :

(ক) সাগরবক্ষে মৃত্যুবরণ করলে এবং স্থলভাগ না পাওয়া গেলে গোসল, কাফন ও জানাযা শেষে কবরে শোয়ানোর দো‘আ পড়ে লাশ সাগরে ভাসিয়ে দিবে। [127]

(খ) কবরে যতদিন মুমিনের লাশের কোন অংশ বাকী থাকবে, ততদিন তাকে সম্মান করতে হবে। সেখানে পুনরায় কবর দেওয়া যাবে না। যদি লাশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ও মাটি হয়ে যায়, তাহ’লে সেখানে পুনরায় দাফন করা যাবে ও সাধারণ মাটির ন্যায় সেখানে সবকিছু করা যাবে। কিন্তু তাই বলে কোন সাধারণ অজুহাতে কবরের সম্মান হানিকর কোন কিছু নির্মাণ করা যাবে না।[128]

(গ) কবর খুঁড়তে গিয়ে যদি প্রথম দিকেই মৃত ব্যক্তির হাড় পাওয়া যায়, তাহ’লে কবর খনন বন্ধ করবে। কিন্তু যদি খনন শেষে পাওয়া যায়, তবে হাড়টিকে কবরের একপাশে রেখেই সেখানে নতুন লাশের কবর দিবে। কেননা এক কবরে একাধিক লাশ দাফন করা জায়েয আছে।[129]

(ঘ) যদি বিনা জানাযায় কারু দাফন হয়ে যায় অথবা জানাযা করে দাফন হ’লেও যদি কেউ পরে জানাযা পড়তে চান, তাহ’লে কবরকে সামনে করে জানাযার ছালাত আদায় করা যাবে। [130]

(ঙ) যদি কোন গর্ভবতী মহিলা মারা যান এবং তার পেটে জীবিত বাচ্চা আছে বলে অভিজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিত হন, তাহ’লে পেট কেটে বাচ্চা বের করে আনা জায়েয আছে।[131]

(চ) শারঈ ওযর বশতঃ যরূরী কারণে কবর পুনঃখনন, লাশ উত্তোলন ও স্থানান্তর করা জায়েয আছে।[132]

(২) মৃতের ক্বাযা ছালাত ও ছিয়াম (قضاء الصلاة والصيام عن الميت) :

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, একজনের ছিয়াম ও ছালাত অন্যজনে করতে পারেনা।[133] কারণ এগুলি দৈহিক ইবাদত, যা নিজেকেই করতে হয়। এগুলি জীবদ্দশায় যেমন অন্যের দ্বারা সম্ভব নয়, মৃতের পরেও তেমনি সম্ভব নয় এবং এগুলির ছওয়াবও অন্যকে দেওয়া যায় না কেবলমাত্র দো‘আ, ছাদাক্বা ও হজ্জ ব্যতীত।[134]

আল্লাহ বলেন, وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلاَّ مَا سَعَى ‘মানুষ সেটাই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে’ (নাজম ৫৩/৩৯)। অবশ্য মানতের ছিয়াম থাকলে উত্তরাধিকারীগণ তা রাখতে পারেন।[135] অথবা প্রতি ছিয়ামের বদলে একজন মিসকীন খাওয়াবেন কিংবা এক মুদ (৬২৫ গ্রাম) গম (বা চাউল) মিসকীনকে দিবেন,[136] যদি তা মাইয়েতের রেখে যাওয়া সম্পদের এক তৃতীয়াংশে সংকুলান হয়। নইলে তা পূরণ করা ওয়ারিছের জন্য ওয়াজিব নয়।[137] জানাযাকালে মৃতের ক্বাযা ছালাতের কাফফারা স্বরূপ টাকা-পয়সা দান করা সম্পূর্ণরূপে একটি বিদ‘আতী প্রথা মাত্র।

(৩) গর্ভচ্যুত শিশুর জানাযা (الصلاة علي السقط) :

(ক) বাচ্চা যদি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে ক্রন্দন করে বা হাঁচি দেয় বা এমন আচরণ করে যাতে তার জীবন ছিল বলে বুঝা যায়, অতঃপর মারা যায়। তবে তার জানাযা পড়তে হবে। ‘এসময় তার মুসলিম বাপ-মায়ের প্রতি ক্ষমা ও অনুগ্রহের জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ করতে হবে’।[138] অর্থাৎ সূরা ফাতিহা, দরূদ ও জানাযার ১ম দো‘আটি পাঠের পর শিশুর জন্য বর্ণিত ৫ম দো‘আটি পাঠ শেষে বলবে, ‘আল্লা-হুম্মাগফির লি আবাওয়াইহে ওয়ারহামহুম’ (হে আল্লাহ! তুমি তার পিতামাতাকে ক্ষমা কর এবং তাদের উপর রহম কর)।

(খ) যদি বাচ্চা চার মাসের আগেই গর্ভচ্যুত হয়, তাহ’লে তাকে গোসল বা জানাযা কিছুই করতে হবে না। বরং কাপড়ে জড়িয়ে দাফন করবে।
(গ) চার মাসের পরের কোন সন্তান যদি মৃত ভূমিষ্ঠ হয়, তবে তারও জানাযা করার প্রয়োজন নেই। কেননা হাদীছে বাচ্চার ‘চীৎকার করার’ কথা এসেছে।[139] গর্ভচ্যুত সন্তানের জানাযা করতে হবে মর্মের ‘আম ছহীহ হাদীছের [140] ভিত্তিতে একদল বিদ্বান গর্ভচ্যুত মৃত সন্তানের জানাযা করার জন্য বলেন। জবাবে শাওকানী বলেন, মায়ের গর্ভে চার মাস অতিক্রম করাটাই শিশুর জীবনের প্রমাণ নয়, বরং ভূমিষ্ট হওয়ার পর কান্নাটাই তার জীবনের প্রমাণ হিসাবে গণ্য হবে। ইমাম মালেক, শাফেঈ, আওযাঈ ও জমহূর বিদ্বানগণ সেকথা বলেন।[141]

(৪) মৃতের প্রতি আদব (احترام الميت) :

(ক) মৃতের প্রতি সাধ্যমত সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। হাদীছে মৃতের হাড্ডি ভাঙ্গাকে জীবিতের হাড্ডি ভাঙ্গার সাথে তুলনা করা হয়েছে।[142] অন্য হাদীছে মৃতের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটতে নিষেধ করা হয়েছে। [143] অতএব যরূরী রাষ্ট্রীয় নির্দেশ ব্যতীত মৃতদেহ কাটাছেঁড়া বা পোষ্ট মর্টেম করা গুরুতর অন্যায়। আজকাল পোষ্ট মর্টেম-এর বিষয়টি অনেকটা সস্তা হয়ে যাচ্ছে। তারপরেও লাশের প্রতি সেখানে অসম্মান করা হয় বলে শোনা যায়। যা থেকে সংশ্লিষ্ট সকলকে অবশ্যই বিরত থাকা কর্তব্য।

(খ) মৃত মুসলিম ব্যক্তিকে গালি দেওয়া নিষেধ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, لاَ تَسُبُّوا الْأَمْوَاتَ فَإِنَّهُمْ قَدْ أَفْضَوْا إِلَى مَا قَدَّمُوْا‘তোমরা মৃতদের গালি দিয়ো না। কেননা তারা তাদের অগ্রিম পেশকৃত অর্জনের প্রতি ধাবিত হয়েছে’।[144] তবে ঐ ব্যক্তি যদি ফাসিক ও বিদ‘আতী হয়, তবে তা থেকে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে সামান্য আলোচনা করা যেতে পারে। নতুবা বিরত থাকতে হবে।[145] কেননা সুন্দর মুসলমানের পরিচয় হ’ল অনর্থক বিষয় সমূহ হ’তে বিরত থাকা।[146] তাছাড়া ‘সন্দেহযুক্ত বিষয়াবলী থেকে নিঃসন্দেহ বিষয়ের দিকে ধাবিত হওয়ার’ জন্য হাদীছে নির্দেশ এসেছে। [147]

(৫) প্রতিবেশীদের কর্তব্য (لزوميات الجيران) :

মৃত্যুর পরে মৃতের প্রতিবেশী ও নিকটাত্মীয়দের কর্তব্য হ’ল, মৃতের পরিবারের লোকদেরকে (কমপক্ষে) একটি দিন ও রাত পেট ভরে খাওয়ানো। জা‘ফর বিন আবু ত্বালিব (রাঃ) শহীদ হ’লে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তার প্রতিবেশীদেরকে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতদ্ব্যতীত বন্ধু-বান্ধব ও সকল হিতাকাংখীর কর্তব্য হ’ল মৃতের উত্তরাধিকারীদের সান্ত্বনা প্রদান করা ও তার বাচ্চাদের মাথায় সহানুভূতির হাত বুলানো।[148] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদেরকে তিন দিনের বেশী কান্নাকাটি করতে নিষেধ করেন।[149]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মৃতের বাড়ীতে গিয়ে তাদেরকে বিভিন্নভাবে সান্ত্বনা দিতেন। নিজের সন্তানহারা কন্যা যয়নব (রাঃ)-কে দেওয়া সর্বোত্তম সান্ত্বনা বাক্য হিসাবে বর্ণিত হাদীছটি নিম্নরূপ :

إِنَّ ِللهِ مَا أَخَذَ وَ ِللهِ مَا أَعْطَى وَكُلُّ شَيْئٍِ عِنْدَهُ إِلَى أجَلٍ مُّسَمَّى فَلْتَصْبِرْ وَلْتَحْتَسِبْ

উচ্চারণ : ইন্না লিল্লা-হি মা আখাযা ওয়া লিল্লা-হি মা আ‘ত্বা; ওয়া কুল্লু শাইয়িন ইনদাহূ ইলা আজালিম মুসাম্মা; ফালতাছবির ওয়াল তাহতাসিব ।
অনুবাদ : ‘নিশ্চয়ই সেটা আল্লাহর জন্য, যেটা তিনি নিয়েছেন এবং সেটাও আল্লাহর জন্য যেটা তিনি দিয়েছেন। প্রত্যেক বস্ত্ত তাঁর নিকটে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য। অতএব তুমি ছবর কর ও ছওয়াবের আকাংখা কর’।[150] ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, কাউকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এটিই সর্বোত্তম হাদীছ।[151]
ফযীলত : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি তার কোন মুমিন ভাইয়ের বিপদে সান্ত্বনা প্রদান করল, আল্লাহ তাকে ক্বিয়ামতের দিন সবুজ রেশমের ঈর্ষণীয় জোড়া পরিধান করাবেন’।[152]

(৬) মৃতের জন্য করণীয় (الأعمال الحسنة للميت) :

১. আল্লাহ বলেন, إِنَّا نَحْنُ نُحْيِ الْمَوْتَى وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُبِينٍ ‘আমরা মৃতকে জীবিত করি এবং লিখে রাখি যা তারা অগ্রে প্রেরণ করে ও যা তারা পশ্চাতে রেখে যায়। আমরা প্রত্যেক বস্ত্ত স্পষ্ট কিতাবে (অর্থাৎ স্ব স্ব আমলনামায়) সংরক্ষিত রাখি’।[153]

২. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ اِنْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ، رواه مسلم-

‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সমস্ত আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কেবল তিনটি আমল ব্যতীত : (ক) ছাদাক্বায়ে জারিয়া (খ) এমন ইল্ম যা থেকে কল্যাণ লাভ হয় এবং (গ) নেককার সন্তান, যে তার জন্য দো‘আ করে’।[154]

৩. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘বান্দা বলে আমার মাল, আমার মাল। অথচ তার মাল তিনটি: (ক) যেটা সে খায় অতঃপর শেষ হয়ে যায় (খ) যেটা সে পরিধান করে অতঃপর তা জীর্ণ হয়ে যায় (গ) যেটা সে ছাদাক্বা দেয় বা দান করে সেটা তার জন্য সঞ্চিত থাকে। বাকী সবকিছু চলে যায় এবং লোকদের জন্য সে ছেড়ে যায়’। [155]

৪. তিনি আরও বলেন, ‘মাইয়েতের সঙ্গে তিনজন যায়। দু’জন ফিরে আসে ও একজন থেকে যায়। তার পরিবার ও মাল ফিরে আসে। কেবল ‘আমল’ তার সাথে থেকে যায়’। [156]

৫. তিনি আরও বলেন, ‘আখেরাতের সুখ-সম্পদের তুলনায় দুনিয়া একটি মরা ছাগলের বাচ্চার চাইতেও তুচ্ছ’।[157]

৬. আল্লাহ বলেন, أَعْدَدْتُ لِعِبَادِى الصَّالِحِينَ مَا لاَ عَيْنَ رَأَتْ، وَلاَ أُذُنَ سَمِعَتْ، وَلاَ خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ ‘আমি আমার সৎকর্মশীল বান্দাদের জন্য এমন সুখ সম্ভার প্রস্ত্তত করে রেখেছি, যা কোন চোখ কখনো দেখেনি, কোন কান কখনো শোনেনি, কোন হৃদয় কখনো কল্পনা করেনি’। [158]

৭. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘জান্নাতের একটি চাবুক রাখার মত ক্ষুদ্রতম স্থান, সমস্ত পৃথিবী ও তার মধ্যকার সম্পদরাজি অপেক্ষা উত্তম’। [159]

(৭) গায়েবানা জানাযা (الصلاة على الغائب) :

গায়েবানা জানাযা জায়েয আছে।[165] তবে সকলের জন্য ঢালাওভাবে এটা জায়েয নয় বলে ইমাম খাত্ত্বাবী, ইবনু আব্দিল বার্র, হাফেয যায়লাঈ, ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ, হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম, শায়খ আলবানী প্রমুখ বিদ্বানগণ মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য সমূহ সংক্ষেপে নিম্নরূপ :

গায়েবানা জানাযার জন্য হাবশার (আবিসিনিয়া) বাদশাহ আছহামা নাজ্জাশীর গায়েবানা জানাযা আদায়ের ঘটনাই হ’ল একমাত্র বিশুদ্ধ দলীল, যিনি ৯ম হিজরী সনে মারা যান। নাজ্জাশী খৃষ্টানদের বাদশাহ ছিলেন। কিন্তু নিজে মুসলমান ছিলেন। সেকারণ তার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবীদের নিয়ে জামা‘আত সহকারে গায়েবানা জানাযা আদায় করেন এবং বলেন, صَلُّوْا عَلَى أَخٍ لَّكُمْ مَاتَ بِغَيْرِ أَرْضِكُمْ ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জানাযা পড়। যিনি তোমাদের দেশ ব্যতীত অন্য দেশে মৃত্যুবরণ করেছেন’।[166] ইমাম আবুদাঊদ নাজ্জাশী বিষয়ক হাদীছের বর্ণনায় অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন এভাবে, باب في الصلاة على المسلم يموت في بلاد الشرك ‘মুশরিক দেশে মৃত্যুবরণকারী মুসলিমের জানাযা’ অনুচ্ছেদ। এতে বুঝা যায় যে, মুশরিক বা অমুসলিম দেশে মুত্যু হওয়ার কারণে যদি কোন মুসলমানের জানাযা হয়নি বলে নিশ্চিত ধারণা হয়, তাহ’লে সেক্ষেত্রে ঐ মুসলমান ভাই বা বোনের জন্য গায়েবানা জানাযা পড়া যাবে।

এ সম্পর্কে দ্বিতীয় দলীল হিসাবে মু‘আবিয়া বিন মু‘আবিয়া লায়ছী আল-মুযানী (রাঃ)-এর গায়েবানা জানাযা পড়ার কথা বলা হয়। মদীনায় তাঁর মৃত্যু হ’লে তাবূকের যুদ্ধে অবস্থানকালে জিব্রীল মারফত এই সংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর গায়েবানা জানাযা পড়েন।[167] ইবনু আব্দিল বার্র ও ইবনু হাজার প্রমুখ বলেন যে, হাদীছটি ‘ছহীহ’ নয়। দ্বিতীয়ত : এ হাদীছে বলা হয়েছে যে, জিব্রীল (আঃ) স্বীয় পাখার ঝাপটায় সব পর্দা উঠিয়ে দেন ও জানাযা উঁচু করে ধরেন। তাতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জানাযা দেখতে পান ও ছালাত আদায় করেন (حتى نظر إليه وصلي عليه)। ফলে সেটা আর গায়েবানা থাকে না। সেকারণ ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেন যে, এই হাদীছ দ্বারা গায়েবানা জানাযার দলীল গ্রহণ বাতিল যোগ্য’।

ইবনু আব্দিল বার্র বলেন, যদি গায়েবানা জানাযা জায়েয হ’ত, তাহ’লে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিশ্চয়ই নিজের ছাহাবীদের গায়েবানা জানাযা আদায় করতেন (যাদের জানাযায় তিনি শরীক হ’তে পারেননি)। অনুরূপ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মুসলমানেরা তাদের প্রিয় চার খলীফার গায়েবানা জানাযা পড়ত। কিন্তু এরূপ কথা কারু থেকে কখনো বর্ণিত হয়নি’। [168]

পরিশেষে বলা যায় যে, গায়েবানা জানাযা নিঃসন্দেহে জায়েয ঐসব ক্ষেত্রে, যাদের জানাযা হয়নি বলে জানা যায়। কিন্তু যাদের জানাযা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেক্ষেত্রে গায়েবানা জানাযা না পড়ায় কোন দোষ নেই। বিশেষ করে আজকাল যেখানে গায়েবানা জানাযা নোংরা রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সেক্ষেত্রে আরও বেশী হুঁশিয়ার হওয়া কর্তব্য।

(৮) কবর যিয়ারত (زيارة القبور) :

কবর যিয়ারত করা সুন্নাত। এর দ্বারা মৃত্যু ও আখেরাতের কথা স্মরণ হয়। কবর আযাবের ভীতি সঞ্চারিত হয়। হৃদয় বিগলিত হয়। চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়। অন্যায় থেকে তওবা এবং নেকীর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পরকালীন মুক্তির প্রেরণা সৃষ্টি হয়। উপরোক্ত উদ্দেশ্যেই কেবল কবর যিয়ারতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নইলে প্রথমে কবর যিয়ারত নিষিদ্ধ ছিল। নারী-পুরুষ সবার জন্য এই অনুমতি রয়েছে। তবে ঐসব নারীদের জন্য লা‘নত করা হয়েছে, যারা কবর যিয়ারতের সময় সরবে কান্নাকাটি ও বিলাপ ধ্বনি করে।

যিয়ারতের সময় এমন কাজ করা যাবে না, যা করলে আল্লাহ নাখোশ হন। যেমন : লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বা দুনিয়াবী স্বার্থে যিয়ারত করা, সেখানে ফুল দেওয়া, কবরবাসীর নিকটে কিছু কামনা করা, সেখানে বসা, ছালাত আদায় করা বা সিজদা করা, তার অসীলায় মুক্তি প্রার্থনা করা, সেখানে দান-ছাদাক্বা ও মানত করা, গরু-ছাগল-মোরগ ইত্যাদি ‘হাজত’ দেওয়া বা কুরবানী করা প্রভৃতি।

সকল প্রকারের শিরকী আক্বীদা ও বিদ‘আতী আমল থেকে মুক্ত মন নিয়ে কেবল মৃতের জন্য দো‘আ এবং আখেরাতকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারত করতে হবে। নইলে ঐ যিয়ারত গোনাহের কারণ হবে। উল্লেখ্য যে, শুধুমাত্র কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে কোথাও সফর করা নিষিদ্ধ। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যিয়ারতের উদ্দেশ্যে ও নেকী হাছিলের জন্য কা‘বা গৃহ, বায়তুল মুক্বাদ্দাস ও মসজিদে নববী ব্যতীত অন্যত্র সফর করতে নিষেধ করেছেন।[169] তাই শুধুমাত্র রাসূল (ছাঃ)-এর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদীনায় যাওয়া নাজায়েয। তবে মসজিদে নববীতে ছালাত আদায়ের নেকী হাছিলের উদ্দেশ্যে কেউ মদীনায় গেলে তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর কবর যিয়ারত করতে পারেন। অতএব হজ্জের সময় যারা মদীনা হয়ে মক্কায় যান, তাদের নিয়ত হ’তে হবে মসজিদে নববীতে ছালাত আদায়ের অশেষ নেকী হাছিল করা।

বর্তমানে যেভাবে রাজনৈতিক নেতাদের ও পীরদের কবর যেয়ারত করা হচ্ছে এবং মৃত পীরের অসীলায় ইহকালীন মঙ্গল ও পরকালীন মুক্তির আশায় মানুষ যেভাবে বার্ষিক ওরস ও অন্যান্য সময়ে বিভিন্ন মাযারে ছুটছে, তাদের সাবধান হওয়া উচিত যে, এর মাধ্যমে তারা দুনিয়া ও আখেরাত দু’টিই হারাচ্ছেন। কেননা আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ)-এর আদেশের বিরোধিতা করলে কেবল আল্লাহর ক্রোধ লাভ হয় ও তাঁর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হ’তে হয়।

যিয়ারতের আদব ( آداب الزيارة ) : এই সময় নিজের মৃত্যু ও আখেরাতকে স্মরণ করবে এবং কবরবাসীদের মাগফেরাতের উদ্দেশ্যে খালেছ মনে নিম্নোক্ত দো‘আ সমূহ পাঠ করবে। দো‘আর সময় একাকী দু’হাত উঠানো যাবে। বাক্বী‘ গারক্বাদ গোরস্থানে দীর্ঘক্ষণ ধরে দো‘আ করার সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একাকী তিন বার হাত উঠিয়েছিলেন। [170] এই সময় স্রেফ দো‘আ ব্যতীত ছালাত, তেলাওয়াত, যিকর-আযকার, দান-ছাদাক্বা কিছুই করা জায়েয নয়।

১ম দো‘আ : এটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আয়েশা (রাঃ)-কে শিক্ষা দিয়েছিলেন।

اَلسَّلاَمُ عَلَى أَهْلِ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُسْلِمِيْنَ، وَيَرْحَمُ اللهُ الْمُسْتَقْدِمِيْنَ مِنَّا وَالْمُسْتَأْخِرِيْنَ، وَإِنَّا إِنْ شَآءَ اللهُ بِكُمْ لَلاَحِقُوْنَ-

উচ্চারণ : আস্সালা-মু ‘আলা আহলিদ দিয়া-রি মিনাল মু’মিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা; ওয়া ইয়ারহামুল্লা-হুল মুস্তাক্বদিমীনা মিন্না ওয়াল মুস্তা’খিরীনা; ওয়া ইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লা লা-হেকূনা।
অনুবাদ : মুমিন ও মুসলিম কবরবাসীদের উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক। আমাদের অগ্রবর্তী ও পরবর্তীদের উপরে আল্লাহ রহম করুন! আল্লাহ চাহে তো আমরা অবশ্যই আপনাদের সাথে মিলিত হ’তে যাচ্ছি’।[171]
২য় দো‘আ : এটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অন্যদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন।-

اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُسْلِمِيْنَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لَلاَحِقُوْنَ، نَسْأَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ-

উচ্চারণ : আস্সালা-মু ‘আলা আহলিদ দিয়া-রি মিনাল মু’মিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা; ওয়া ইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লা লা-হেকূনা। নাসআলুল্লা-হা লানা ওয়া লাকুমুল ‘আ-ফিয়াতা’।
অনুবাদ : মুমিন ও মুসলিম কবরবাসীগণ! আপনাদের উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক! আল্লাহ চাহে তো আমরা অবশ্যই আপনাদের সাথে মিলিত হ’তে যাচ্ছি। আমাদের ও আপনাদের জন্য আমরা আল্লাহর নিকটে মঙ্গল কামনা করছি’।[172]
৩য় দো‘আ :

السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لاَحِقُونَ، اللَّهُمَّ اغْفِرْلَهُمْ-

উচ্চারণ : আসসালামু ‘আলায়কুম দা-রা ক্বাওমিন মু’মিনীনা, ওয়া ইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লা-হেকূনা; আল্লা-হুম্মাগফিরলাহুম।
অনুবাদ : মুমিন কবরবাসীদের উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক। আল্লাহ চাহে তো আমরা অবশ্যই আপনাদের সাথে মিলিত হ’তে যাচ্ছি। হে আল্লাহ! তুমি তাদেরকে ক্ষমা করে দাও। [173]

তিরমিযী বর্ণিত ‘আসসালামু ‘আলায়কুম ইয়া আহলাল কুবূরে! ইয়াগফিরুল্লা-হু লানা ওয়া লাকুম’ বলে প্রসিদ্ধ হাদীছটি ‘যঈফ’। [174]

জ্ঞাতব্য :

কাফির-মুশরিক বাপ-মায়ের কবর যিয়ারত করা যাবে। ক্রন্দন করা যাবে। কেননা এর মাধ্যমে মৃত্যুকে স্মরণ করা হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে সালাম করা যাবে না। তাদের জন্য আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে তাঁর মায়ের কবর যিয়ারতের জন্য অতটুকুই মাত্র অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।[175]


[1] . ইবনু মাজাহ হা/১৫২৬ ‘জানায়েয’ অধ্যায়-৬, ‘আহলে ক্বিবলার উপর ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩১; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৭১, ২৭৯-৮০।
[2] . ইবনু মাজাহ হা/১৫১৯; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৮২-৮৩, ২৭১।
[3] . ইবনুন নাজ্জার আল-ফুতূহী, শারহুল মুনতাহা (বৈরূত : দার খিযর ১৪১৯/১৯৯৮) ৩/৫৫-৬৭; নাসাঈ হা/১৯৮৭, ৮৯।
[4] . ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৭৭।
[5] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৬৫১, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘জানাযার ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৫।
[6] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৬৫২, ৫৭, ৫৮; আবুদাঊদ হা/৬৬২। উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর লাশ তাঁর শয়ন কক্ষেই রাখা হয়েছিল


৭. ইশরাক্ব ও চাশতের ছালাত (صلاة الإشراق والضحى)


‘শুরূক্ব’ অর্থ সূর্য উদিত হওয়া। ‘ইশরাক্ব’ অর্থ চমকিত হওয়া। ‘যোহা’ অর্থ সূর্য গরম হওয়া। এই ছালাত সূর্যোদয়ের পরপরই প্রথম প্রহরের শুরুতে পড়লে একে ‘ছালাতুল ইশরাক্ব’ বলা হয় এবং কিছু পরে দ্বিপ্রহরের পূর্বে পড়লে তাকে ‘ছালাতুয যোহা’ বা চাশতের ছালাত বলা হয়। এই ছালাত বাড়ীতে পড়া ‘মুস্তাহাব’। এটি সর্বদা পড়া এবং আবশ্যিক গণ্য করা ঠিক নয়। কেননা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) কখনও পড়তেন, কখনো ছাড়তেন।[1]

ফযীলত : আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি ফজরের ছালাত জামা‘আতে পড়ে, অতঃপর সূর্য ওঠা পর্যন্ত আল্লাহর যিকরে বসে থাকে, অতঃপর দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে, তার জন্য পূর্ণ একটি হজ্জ ও ওমরাহর নেকী হয়।[2] ইমাম নববী বলেন, ‘ইবনু ওমর (রাঃ) ছালাতুয যোহাকে বিদ‘আত বলেছেন’ তার অর্থ হ’ল, এটি নিয়মিত মসজিদে পড়া বিদ‘আত।[3] বুরাইদা আসলামী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘মানুষের শরীরে ৩৬০টি জোড় রয়েছে। অতএব মানুষের কর্তব্য হ’ল প্রত্যেক জোড়ের জন্য একটি করে ছাদাক্বা করা। ছাহাবীগণ বললেন, কার শক্তি আছে এই কাজ করার, হে আল্লাহর নবী? তিনি বললেন, চাশতের দু’রাক‘আত ছালাতই এজন্য যথেষ্ট।[4] চাশতের ছালাতের রাক‘আত সংখ্যা ২, ৪, ৮, ১২ পর্যন্ত পাওয়া যায়। মক্কা বিজয়ের দিন দুপুরের পূর্বে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) হযরত আলী (রাঃ)-এর বোন উম্মে হানীর গৃহে খুবই সংক্ষিপ্তভাবে ৮ রাক‘আত পড়েছিলেন।[5] প্রতি দু’রাক‘আত অন্তর সালাম ফিরাতে হয়।

উল্লেখ্য যে, দুপুরের পূর্বের এই ছালাতকেই ‘ছালাতুল আউওয়াবীন’ বলে।[6] মাগরিবের পরের ছয়, বিশ বা যে কোন পরিমাণ নফল ছালাতকে আউওয়াবীন বলার হাদীছগুলি যঈফ। [7]


[1] . মির‘আত শরহ মিশকাত ‘ছালাতুয যোহা’ অনুচ্ছেদ-৩৮; ৪/৩৪৪-৫৮।
[2] . তিরমিযী হা/৫৮৬, মিশকাত হা/৯৭১ ‘ছালাতের পরে যিকর’ অনুচ্ছেদ-১৮।
[3] . মির‘আত ৪/৩৪৬।
[4] . আবুদাঊদ, মুসলিম, মিশকাত হা/১৩১৫, ১৩১১ ‘ছালাতুয যোহা’ অনুচ্ছেদ-৩৮।
[5] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩০৯ ‘ছালাতুয যোহা’ অনুচ্ছেদ-৩৮।
[6] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৩১২; মির‘আত ৪/৩৫১।
[7] . তিরমিযী, মিশকাত ১১৭৩-৭৪, সিলসিলা যঈফাহ হা/৪৬৯, ৪৬৭, ৪৬১৭।


৮. সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণের ছালাত (صلاة الكسوف والخسوف)


সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণ কালে যে নফল ছালাত আদায় করা হয়, তাকে ছালাতুল কুসূফ ও খুসূফ বলা হয়। সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণ আল্লাহ্র অপার কুদরতের অন্যতম নিদর্শন। এই গ্রহণ শুরু হ’লে আল্লাহ্র প্রতি গভীর আনুগত্য ও ভীতি সহকারে এর ক্ষতি থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে জামা‘আত সহ দু’রাক‘আত ছালাত দীর্ঘ ক্বিরাআত ও ক্বিয়াম সহকারে আদায় করতে হয় এবং শেষে খুৎবা দিতে হয়।[1] এই ছালাতের বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। যাতে দু’রাক‘আত ছালাতে (২+২) ৪টি রুকূ হয় এবং এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ।[2]

পদ্ধতি : আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সময়ে একবার সূর্য গ্রহণ হ’লে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) ছালাত আদায় করেন ও লোকেরাও তাঁর সাথে ছালাত আদায় করে। প্রথমে তিনি ছালাতে দাঁড়ালেন এবং সূরা বাক্বারাহ্র মত দীর্ঘ ক্বিরাআত করলেন। অতঃপর (১) দীর্ঘ রুকূ করলেন। তারপর মাথা তুলে ক্বিরাআত করতে লাগলেন। তবে প্রথম ক্বিরাআতের চেয়ে কিছুটা কম ক্বিরাআত করে (২) রুকূতে গেলেন। এবারের রুকূ প্রথম রুকূর চেয়ে কিছুটা কম হ’ল। তারপর তিনি রুকূ থেকে মাথা তুলে সিজদা করলেন। অতঃপর সিজদা শেষে তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং লম্বা ক্বিরাআত করলেন। তবে প্রথমের তুলনায় কিছুটা ছোট। এরপর তিনি (৩) রুকূ করলেন, যা আগের রুকূর চেয়ে কম ছিল। রুকূ থেকে মাথা তুলে পুনরায় ক্বিরাআত করলেন। যা প্রথমের তুলনায় ছোট ছিল। অতঃপর তিনি (৪) রুকূ করলেন ও মাথা তুলে সিজদায় গেলেন। পরিশেষে সালাম ফিরালেন।

ইতিমধ্যে সূর্য উজ্জ্বল হয়ে গেল। অতঃপর ছালাত শেষে দাঁড়িয়ে তিনি খুৎবা দিলেন এবং হামদ ও ছানা শেষে বললেন যে, সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহ্র নিদর্শন সমূহের মধ্যে দু’টি বিশেষ নিদর্শন। কারু মৃত্যু বা জন্মের কারণে এই গ্রহণ হয় না। যখন তোমরা ঐ গ্রহণ দেখবে, তখন আল্লাহকে ডাকবে, তাকবীর দিবে, ছালাত আদায় করবে ও ছাদাক্বা করবে। … আল্লাহ্র কসম! আমি যা জানি, তা যদি তোমরা জানতে, তাহ’লে তোমরা অল্প হাসতে ও অধিক ক্রন্দন করতে’। অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, এর মাধ্যমে আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের ভয় দেখিয়ে থাকেন। অতএব যখন তোমরা সূর্য গ্রহণ দেখবে, তখন ভীত হয়ে আল্লাহ্র যিকর, দো‘আ ও ইস্তেগফারে রত হবে। [3]

বিজ্ঞানের যুক্তি : সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণের সময় চন্দ্র, সূর্য ও পৃথিবী একই সরলরেখায় চলে আসে। ফলে সূর্য ও চন্দ্রের আকর্ষণী শক্তি বেশী মাত্রায় পৃথিবীর উপরে পতিত হয়। এর প্রচন্ড টানে অন্য কোন গ্রহ থেকে পাথর বা কোন মহাজাগতিক বস্ত্ত পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসলে পৃথিবী ধ্বংসের একটা কারণও হ’তে পারে। ১৯০৮ সালের ৩০ শে জুন ১২ মেগাটন টিএনটি ক্ষমতা সম্পন্ন ১৫০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি বিশালাকার জ্বলন্ত পাথর (মিটিওরাইট) রাশিয়ার সাইবেরিয়ার জঙ্গলে পতিত হয়ে ৪০ মাইল ব্যাস সম্পন্ন ধ্বংসগোলক সৃষ্টি করেছিল। আগুনের লেলিহান শিখায় লক্ষ লক্ষ গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।[4]

‘কুসূফ’ ও ‘খুসূফ’-এর ছালাত আদায়ের মাধ্যমে সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণের ক্ষতিকর প্রভাব হ’তে আল্লাহ্র নিকটে পানাহ চাওয়া হয়। এই ছালাতের অন্যতম উদ্দেশ্য হ’ল, আল্লাহ্র এই সব সৃষ্টিকে পূজা না করা এবং ভয় না করা। আল্লাহ বলেন, 

لاَ تَسْجُدُوْا لِلشَّمْسِ وَلاَ لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوْا ِللهِ الَّذِيْ خَلَقَهُنَّ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُوْنَ 

‘তোমরা সূর্যকে সিজদা করো না, চন্দ্রকেও না। বরং সিজদা কর আল্লাহকে, যিনি এগুলি সৃষ্টি করেছেন। যদি তোমরা সত্যিকার অর্থে তাঁরই ইবাদত করে থাক’ (হা-মীম সাজদাহ/ফুছছিলাত ৪১/৩৭)।


[1] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৪৮২-৮৩, ‘চন্দ্র গ্রহণের ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৫০।
[2] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৪৮০, ৮২, টীকা-আলবানী দ্রঃ পৃঃ ১/৪৬৯; মুসলিম, মিশকাত হা/১৪৮৫।
[3] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৪৮২-৮৪। উল্লেখ্য যে, ঘটনাক্রমে সূর্য গ্রহণের দিন নবীপুত্র ইবরাহীম ১৮ মাস বয়সে মদীনায় ইন্তেকাল করেন (১০ম হিজরী ২৯ শাওয়াল সোমবার ২৭শে জানুয়ারী ৬৩২ খৃঃ)। সে সময় আরবদের মধ্যে ধারণা প্রচলিত ছিল যে, উচ্চ সম্মানিত কোন মানুষের মৃত্যুর কারণেই সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হয়ে থাকে’ (বুখারী হা/১০৬৩, ‘কুসূফ’ অধ্যায় ১৭ অনুচ্ছেদ; মুসলিম, মিশকাত হা/১৪৮৫; সুলায়মান মানছূরপুরী, রহমাতুল লিল আলামীন (দিল্লী : ১৯৮০ খৃঃ) ২/৯৭-৯৮ পৃঃ।
[4] . ঢাকা, দৈনিক ইনকিলাব, ৪ঠা ফেব্রুয়ারী ২০০০, পৃঃ ১১। উল্লেখ্য যে, ১০ লাখ টনে এক মেগাটন হয়।


৯. ছালাতুল ইস্তিস্ক্বা (صلاة الإستسقاء)


ইস্তিস্ক্বা অর্থ : পান করার জন্য পানি প্রার্থনা করা। শারঈ পরিভাষায় ব্যাপক খরা ও অনাবৃষ্টির সময় বিশেষ পদ্ধতিতে ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহর নিকটে পানি প্রার্থনা করাকে ‘ছালাতুল ইস্তিস্ক্বা’ বলা হয়। ৬ষ্ঠ হিজরীর রামাযান মাসে সর্বপ্রথম মদীনায় ইস্তিসক্বার ছালাতের প্রবর্তন হয়।[1]

বিবরণ : মলিন ও পরিচ্ছন্ন পোষাক পরে চাদর গায়ে দিয়ে বিনয়-নম্র চিত্তে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ময়দান অভিমুখে রওয়ানা হবে। সাথে ইমামের জন্য মিম্বর নিতে পারবে। অতঃপর নিম্নের যে কোন একটি পদ্ধতি অবলম্বনে ইস্তিসক্বার ছালাত আদায় করবে।

পদ্ধতি-১ : ঈদের ছালাতের ন্যায় আযান ও ইক্বামত ছাড়াই প্রথমে জামা‘আত সহ দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে।[2] ইমাম সরবে ক্বিরাআত করবেন। প্রথম রাক‘আতে সূরা আ‘লা ও দ্বিতীয় রাক‘আতে সূরা গাশিয়াহ কিংবা অন্য যে কোন সূরা পড়বেন। অতঃপর ছালাত শেষে ইমাম মিম্বরে বসে বা দাঁড়িয়ে অথবা মিম্বর ছাড়াই মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রথমে আল্লা-হু আকবর, আলহামদু লিল্লা-হি রবিবল ‘আলামীন ওয়াছ ছালাতু ওয়াসসালামু ‘আলা রাসূলিহিল কারীম’ বলে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূল (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ শেষে মুছল্লীদের প্রতি ইস্তিস্ক্বার গুরুত্ব সম্পর্কে ঈমান বর্ধক উপদেশসহ সংক্ষিপ্ত খুৎবা দিবেন। [3] অতঃপর ইমাম ও মুক্তাদী সকলে ক্বিবলামুখী দাঁড়িয়ে স্ব স্ব চাদর উল্টাবে। অর্থাৎ চাদরের নীচের অংশ উপরের দিকে উল্টে নিবেন এবং চাদরের ডান পাশ বাম কাঁধে ও বাম পাশ ডান কাঁধে রাখবে। অতঃপর দু’হাত উপুড় অবস্থায় সোজাভাবে চেহারা বরাবর উঁচু রাখবে, যেন বগল খুলে যায়। [4]

অতঃপর নিম্নের দো‘আ সমূহ পাঠ করবেন-

(1) اَلْحَمْدُ ِللهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ، مَالِكِ يَوْمِ الدِّيْنِ، لآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ يَفْعَلُ مَا يُرِيْدُ- اَللَّهُمَّ أَنْتَ اللهُ لآ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ، أَنْتَ الْغَنِيُّ وَنَحْنُ الْفُقَرَاءُ، أَنْزِلْ عَلَيْنَا الْغَيْثَ وَاجْعَلْ مَا أَنْزَلْتَ عَلَيْنَا قُوَّةً وَّ بَلاَغًا إِلَى حِيْنٍ-

(১) উচ্চারণ : আলহামদুলিল্লা-হি রবিবল ‘আ-লামীন, আররহমা-নির রহীম, মা-লিকি ইয়াওমিদ্দীন। লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ইয়াফ‘আলু মা ইউরীদু। আল্লা-হুম্মা আনতাল্লা-হু লা ইলা-হা ইল্লা আনতা। আনতাল গানিইয়ু ওয়া নাহ্নুল ফুক্বারা-উ। আনঝিল ‘আলায়নাল গায়ছা ওয়াজ‘আল মা আনঝালতা ‘আলায়না কুউওয়াতাঁও ওয়া বালা-গান ইলা হীন।
অনুবাদ: সকল প্রশংসা বিশ্বপালক আল্লাহর জন্য। যিনি করুণাময় ও কৃপানিধান। যিনি বিচার দিবসের মালিক। আল্লাহ ব্যতীত কোন মা‘বূদ নেই। তিনি যা ইচ্ছা তাই-ই করেন। হে প্রভু! আপনি আল্লাহ। আপনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আপনি মুখাপেক্ষীহীন ও আমরা সবাই মুখাপেক্ষী। আমাদের উপরে আপনি বৃষ্টি বর্ষণ করুন! যে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তা যেন আমাদের জন্য শক্তির কারণ হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদী কল্যাণ লাভে সহায়ক হয়’।[5]

(2) اَللَّهُمَّ اسْقِ عِبَادَكَ وَبَهَائِمَكَ وَانْشُرْ رَحْمَتَكَ وَاحْيِ بَلَدَكَ الْمَيِّتَ-

(২) উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাস্ক্বে ‘ইবা-দাকা ওয়া বাহা-এমাকা ওয়ানশুর রহমাতাকা ওয়াহ্ইয়ে বালাদাকাল মাইয়েতা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি পান করান আপনার বান্দাদেরকে ও জীবজন্তু সমূহকে এবং আপনার রহমত ছড়িয়ে দিন ও আপনার মৃত জনপদকে পুনর্জীবিত করুন’। [6]

(3) اَللَّهُمَّ اسْقِنَا غَيْثًا مُّغِيْثًا مَّرِيْئًا مَّرِيْعًا، نَافِعًا غَيْرَ ضَارٍّ عَاجِلاً غَيْرَ آجِلٍ-

(৩) উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাসক্বেনা গায়ছাম মুগীছাম মারীআম মারী‘আ, না-ফে‘আন গায়রা যা-র্রিন ‘আ-জেলান গায়রা আ-জেলিন।
অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এমন বৃষ্টি দান করুন, যা চাহিদা পূরণকারী, পিপাসা নিবারণকারী ও শস্য উৎপাদনকারী। যা ক্ষতিকর নয় বরং উপকারী এবং যা দেরীতে নয় বরং দ্রুত আগমনকারী’।[7]

এই সময় বৃষ্টি দেখলে বলবে, اَللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا আল্লা-হুম্মা ছাইয়েবান না-ফে‘আন (হে আল্লাহ! উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ করুন)।[8] বৃষ্টিতে চাদর ভিজিয়ে আল্লাহর বিশেষ রহমত মনে করে আগ্রহের সাথে তা বরণ করে নিতে হবে। [9]

পদ্ধতি-২ : প্রথমে সংক্ষিপ্ত খুৎবা দিবেন। অতঃপর দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবেন।[10] অতঃপর দাঁড়িয়ে পূর্বে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী দো‘আ করতে থাকবেন।

তাৎপর্য : চাদর উল্টানোর মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যেন খরা উল্টে গিয়ে বৃষ্টিপাত হয়।[11] এছাড়াও রয়েছে রাজাধিরাজ আল্লাহর সামনে বান্দার পরিবর্তিত অসহায় অবস্থার ইঙ্গিত। দাঁড়িয়ে দু’হাত উপুড় ও সোজাভাবে ধরে রাখার মধ্যে রয়েছে পালনকর্তা আল্লাহর প্রতি চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ ও একান্তভাবে আত্মনিবেদনের ইঙ্গিত। ময়দানে বেরিয়ে একত্রিত হয়ে বৃষ্টি প্রার্থনার মধ্যে রয়েছে একই বিষয়ে হাযারো বান্দার ঐকান্তিক প্রার্থনার গুরুত্ববহ ইঙ্গিত।

ছালাত ব্যতীত অন্যভাবে বৃষ্টি প্রার্থনা :

(ক) জুম‘আর খুৎবা দানের সময় খত্বীব দু’হাত উঠিয়ে আল্লাহর নিকটে বৃষ্টি প্রার্থনা করবেন। একই সাথে মুছল্লীগণ হাত উঠিয়ে দো‘আ করবেন (অথবা ‘আমীন’ ‘আমীন’ বলবেন)। এ সময়ের সংক্ষিপ্ত দো‘আ হ’ল اَللَّهُمَّ اَغِثْنَا আল্লা-হুম্মা আগিছনা (হে আল্লাহ! আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন) কমপক্ষে ৩ বার।[12] অথবা اَللَّهُمَّ اسْقِنَا আল্লা-হুম্মাস্ক্বেনা (হে আল্লাহ! আমাদেরকে পানি পান করান) কমপক্ষে ৩ বার। [13]

(খ) জুম‘আ ও ইস্তিসক্বার ছালাত ছাড়াই স্রেফ দো‘আর মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করা। এ সময় দু’হাত তুলে বর্ণিত ৩নং দো‘আটি ও অন্যান্য দো‘আ সমূহ পাঠ করবে। [14]

অন্যান্য জ্ঞাতব্য :

(ক) জীবিত কোন মুত্তাক্বী পরহেযগার ব্যক্তির মাধ্যমে আল্লাহর নিকটে বৃষ্টি প্রার্থনা করা যাবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পরে তাঁর চাচা আববাস (রাঃ)-এর মাধ্যমে ওমর (রাঃ) বৃষ্টি প্রার্থনা করতেন।[15] কিন্তু কোন মৃত ব্যক্তির দোহাই বা অসীলা দিয়ে বৃষ্টি প্রার্থনা করা যাবেনা। কারণ এটি হ’ল সবচেয়ে বড় শিরক।

(খ) ইস্তিস্ক্বার খুৎবা সাধারণ খুৎবার মত নয়। এটির সবটুকুই কেবল আকুতিভরা দো‘আ আর তাকবীর মাত্র। [16]

(গ) অতিবৃষ্টি হ’লে বলবে, اَللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا আল্লা-হুম্মা ছাইয়েবান না-ফে‘আন (হে আল্লাহ! উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ করুন)। [17] আর তাতে ব্যাপক ক্ষতির আশংকা দেখা দিলে তা ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ করে বলবে, اَللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلاَ عَلَيْنَاআল্লা-হুম্মা হাওয়া-লায়না অলা ‘আলায়না (হে আল্লাহ! আমাদের থেকে ফিরিয়ে নাও। আমাদের উপর দিয়ো না)। [18]


[1] . মির‘আত ৫/১৭০।
[2] . আবুদাঊদ হা/১১৬১, ৬৫; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৪৯৭; মির‘আত ৫/১৭৯।
[3] . আবুদাঊদ হা/১১৬৫, ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে; বুখারী হা/১০২২ ‘দাঁড়িয়ে ইস্তিস্কার দো‘আ পাঠ’ অনুচ্ছেদ-১৫; মির‘আত ৫/১৮৯।
[4] . আবুদাঊদ হা/১১৬৪, ৬৮; ঐ, মিশকাত হা/১৫০৪; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৬১; মির‘আত ৫/১৭৬।
[5] . আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৫০৮, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘ইস্তিস্কা’ অনুচ্ছেদ-৫২।।
[6] . মুওয়াত্ত্বা, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৫০৬ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘ইস্তিস্ক্বা’ অনুচ্ছেদ-৫২।
[7] . আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৫০৭।
[8] . বুখারী হা/১০৩২, মিশকাত হা/১৫০০।
[9] . মুসলিম, মিশকাত হা/১৫০১।
[10] . আবুদাঊদ হা/১১৬৫, ৭৩; মিশকাত হা/১৫০৮; মির‘আত ৫/১৭৮।
[11] . হাকেম, বায়হাক্বী, মির‘আত ৫/১৭৬।
[12] . বুখারী হা/১০১৪, ১০২৯ ‘ইস্তিসক্বা’ অধ্যায়-১৫, অনুচ্ছেদ-৭, ২১।
[13] . বুখারী হা/১০১৩, অনুচ্ছেদ-৬।
[14] . ইবনু মাজাহ হা/১২৬৯।
[15] . বুখারী হা/১০১০, মিশকাত হা/১৫০৯।
[16] . আবুদাঊদ হা/১১৬৫।
[17] . বুখারী হা/১০৩২, মিশকাত হা/১৫০০।
[18] . বুখারী হা/৯৩৩, ১০২১; আবুদাঊদ হা/১১৭৪; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৫৯০২, অধ্যায়-২৯, অনুচ্ছেদ-৭


১০. ছালাতুল হাজত (صلاة الحاجة)


বিশেষ কোন বৈধ চাহিদা পূরণের জন্য আল্লাহর উদ্দেশ্যে যে দু’রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করা হয়, তাকে ‘ছালাতুল হাজত’ বলা হয়।[1] সঙ্গত কোন প্রয়োজন পূরণের জন্য বান্দা স্বীয় প্রভুর নিকটে ছবর ও ছালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করবে’ (বাক্বারাহ ২/১৫৩)। এজন্য শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর সালাম ফিরানোর পূর্বে আশু প্রয়োজনীয় বিষয়টির কথা নিয়তের মধ্যে এনে নিম্নোক্ত সারগর্ভ দো‘আটি পাঠ করবে। 

اَللَّهُمَّ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ- 

(আল্লা-হুম্মা রববানা আ-তিনা ফিদ্দুন্ইয়া হাসানাতাঁও ওয়া ফিল আ-খেরাতে হাসানাতাঁও ওয়া ক্বিনা আযা-বান্না-র)। ‘হে আল্লাহ! হে আমাদের পালনকর্তা! আপনি আমাদেরকে দুনিয়াতে মঙ্গল দিন ও আখেরাতে মঙ্গল দিন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব হ’তে রক্ষা করুন’। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অধিকাংশ সময় এ দো‘আটিই পড়তেন’।[2]

দো‘আটি সিজদায় পড়লে বলবে, اَللَّهُمَّ آتِنَا… আল্লা-হুম্মা আ-তিনা…। কেননা রুকূ-সিজদায় কুরআনী দো‘আ পড়া চলে না। [3]

হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, 

كَانَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا حَزَبَهُ أَمْرٌ صَلَّى 

‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন কোন সংকটে পড়তেন, তখন ছালাতে রত হ’তেন’।[4]

উক্ত বিষয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর স্ত্রী সারা’র ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। যখন তিনি অপহৃত হয়ে মিসরের লম্পট সম্রাটের নিকটে নীত হলেন ও অত্যাচারী সম্রাট তার দিকে এগিয়ে গেল, তখন তিনি ওযূ করে ছালাতে রত হয়ে আল্লাহর নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলেছিলেন,

اَللَّهُمَّ لاَ تُسَلِّطْ عَلَىَّ هَذَا الْكَافِرَ 

‘হে আল্লাহ! এই কাফেরকে তুমি আমার উপর বিজয়ী করোনা’। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন এবং উক্ত লম্পটের হাত-পা অবশ হয়ে পড়েছিল। তিন-তিনবার ব্যর্থ হয়ে অবশেষে সে বিবি সারা-কে সসম্মানে মুক্তি দেয় এবং বহুমূল্যবান উপঢৌকনাদি সহ তার খিদমতের জন্য হাজেরাকে তার সাথে ইবরাহীমের নিকট পাঠিয়ে দেয়।[5]


[1] . ইবনু মাজাহ হা/১৩৮৫, ছালাত অধ্যায়-২ অনুচ্ছেদ-১৮৯।
[2] . বুখারী হা/৪৫২২, ৬৩৮৯; ঐ, মিশকাত হা/২৪৮৭, মুসলিম, মিশকাত হা/৮১৩।
[3] . মুসলিম, মিশকাত হা/৮৭৩, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘রুকূ’ অনুচ্ছেদ-১৩; নায়ল ৩/১০৯।
[4] . আবুদাঊদ হা/১৩১৯ ‘ছালাত’ অধ্যায়-২, অনুচ্ছেদ-৩১২; ছহীহুল জামে‘ হা/৪৭০৩; ঐ, মিশকাত হা/১৩১৫।
[5] . বুখারী হা/২২১৭ ‘ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায়-৩৪, অনুচ্ছেদ-১০০; আহমাদ হা/৯২৩০, সনদ ছহীহ।

১১. ছালাতুত তাওবাহ (صلاة الةوبة)


অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য বিশেষভাবে যে নফল ছালাত আদায় করা হয়, তাকে ‘ছালাতুত তাওবাহ’ বলা হয়। আবুবকর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, কোন লোক যদি গোনাহ করে। অতঃপর উঠে দাঁড়ায় ও পবিত্রতা অর্জন করে এবং দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে। অতঃপর আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।[1] ত্বাবারাণী কাবীরে ‘হাসান’ সনদে আবুদ্দারদা (রাঃ) হ’তে ‘মরফূ’ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, উক্ত ছালাত দুই বা চার রাক‘আত ফরয কিংবা নফল পূর্ণ ওযূ ও সুন্দর রুকূ-সিজদা সহকারে হ’তে হবে। [2] তওবার জন্য নিম্নের দো‘আটি বিশেষভাবে সিজদায় ও শেষ বৈঠকে সালাম ফিরানোর পূর্বে পাঠ করা উচিত।-

أَسْتَغْفِرُ اللهَ الَّذِيْ لآ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّوْمُ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ-

উচ্চারণ : আস্তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা ইলা-হা ইল্লা হুওয়াল হাইয়ুল ক্বাইয়ূমু ওয়া আতূবু ইলাইহে। অনুবাদ : ‘আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি সেই আল্লাহর নিকটে যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। যিনি চিরঞ্জীব ও বিশ্ব চরাচরের ধারক এবং তাঁর দিকেই আমি ফিরে যাচ্ছি বা তওবা করছি’।[3] ‘সাইয়েদুল ইস্তেগফার’ দো‘আটিও এর সাথে যোগ করা ভাল (দ্র: দো‘আ নং ১৩)।


[1] . আবুদাঊদ, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, বায়হাক্বী, তিরমিযী, হাদীছ হাসান; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৫৯; মিশকাত হা/১৩২৪ ‘ঐচ্ছিক ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩৯; আলে ইমরান ৩/১৩৫।
[2] . ত্বাবারাণী কাবীর, আহমাদ হা/২৭৫৮৬; ছহীহাহ হা/৩৩৯৮; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৩০।
[3] . তিরমিযী, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/২৩৫৩ ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৯, ‘ক্ষমা প্রার্থনা ও তওবা করা’ অনুচ্ছেদ-৪।

১২. ছালাতুল ইস্তেখা-রাহ (صلوة الإسةخارة)


আল্লাহর নিকট থেকে কল্যাণ ইঙ্গিত প্রার্থনার জন্য যে নফল ছালাত আদায় করা হয়, তাকে ‘ছালাতুল ইস্তেখা-রাহ’ বলা হয়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় কোন্ শুভ কাজটি করা মঙ্গলজনক হবে, সে বিষয়ে আল্লাহর নিকট থেকে ইঙ্গিত পাওয়ার জন্য বিশেষভাবে এই ছালাত আদায় করা হয়। কোন দিকে ঝোঁক না রেখে সম্পূর্ণ নিরাবেগ ও খোলা মনে ইস্তেখারার ছালাত আদায় করবে। অতঃপর যেদিকে মন টানবে, সেভাবেই কাজ করবে। এ জন্য ফরয ছালাত ব্যতীত ইস্তেখারার নিয়ত সহ দু’রাক‘আত নফল ছালাত দিনে বা রাতে যেকোন সময়ে পড়া যায়।

ইস্তেখারার দো‘আ এক রাক‘আত বিশিষ্ট বিতর ছালাতে পড়া উচিত নয়। বরং এক-এর অধিক রাক‘আত বিশিষ্ট বিতরে বা যে কোন সুন্নাত-নফলে পড়া যায়। [1]

জাবের (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে সকল কাজে ‘ইস্তেখা-রাহ’ শিক্ষা দিতেন, যেভাবে তিনি আমাদেরকে কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতেন। তিনি বলেছেন, তোমদের কেউ যখন কোন কাজের সংকল্প করবে, তখন ফরয ব্যতীত দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে। অতঃপর বলবে।-

اَللَّهُمَّ إِنِّيْ أَسْتَخِيْرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيْمِ، فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلاَ أَقْدِرُ وَتَعْلَمُ وَلاَ أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلاَّمُ الْغُيُوْبِ، اَللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ خَيْرٌ لِّيْ فِيْ دِيْنِيْ وَمَعَاشِيْ وَعَاقِبَةِ أَمْرِيْ فَاقْدِرْهُ لِيْ وَيَسِّرْهُ لِيْ ثُمَّ بَارِكْ لِيْ فِيْهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرٌّ لِّيْ فِيْ دِيْنِيْ وَمَعَاشِيْ وَعَاقِبَةِ أَمْرِيْ فَاصْرِفْهُ عَنِّيْ وَاصْرِفْنِيْ عَنْهُ وَاقْدِرْ لِيَ الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِيْ بِهِ، قَالَ: (وَيُسَمِّي حَاجَتَهُ)- رواه البخارىُّ-

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস্তাখীরুকা বি‘ইলমিকা ওয়া আস্তাক্বদিরুকা বি ক্বুদরাতিকা, ওয়া আসআলুকা মিন ফাযলিকাল ‘আযীম। ফাইন্নাকা তাক্বদিরু ওয়া লা আক্বদিরু, ওয়া তা‘লামু ওয়া লা আ‘লামু, ওয়া আনতা ‘আল্লা-মুল গুয়ূব। আল্লা-হুম্মা ইন কুনতা তা‘লামু আন্না হা-যাল আমরা খায়রুল লী ফী দ্বীনী ওয়া মা‘আ-শী ওয়া ‘আ-ক্বিবাতি আমরী, ফাক্বদিরহু লী ওয়া ইয়াসসিরহু লী; ছুম্মা বা-রিক লী ফীহি। ওয়া ইন কুনতা তা‘লামু আন্না হা-যাল আমরা শার্রুল লী ফী দ্বীনী ওয়া মা‘আ-শী ওয়া ‘আ-ক্বিবাতি আমরী, ফাছরিফহু ‘আন্নী ওয়াছরিফনী ‘আনহু, ওয়াক্বদির লিয়াল খায়রা হায়ছু কা-না, ছুম্মা আরযিনী বিহী।

অনুবাদ : হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট তোমার জ্ঞানের সাহায্যে কল্যাণের বিষয়টি প্রার্থনা করছি এবং তোমার শক্তির মাধ্যমে (সেটা অর্জন করার) শক্তি প্রার্থনা করছি। আমি তোমার মহান অনুগ্রহ ভিক্ষা চাইছি। কেননা তুমিই ক্ষমতা রাখ। আমি ক্ষমতা রাখি না। তুমিই জানো, আমি জানি না। তুমিই যে অদৃশ্য বিষয় সমূহের মহাজ্ঞানী।

হে আল্লাহ! যদি তুমি জানো যে, এ কাজটি আমার জন্য উত্তম হবে আমার দ্বীনের জন্য, আমার জীবিকার জন্য ও আমার পরিণাম ফলের জন্য, তাহ’লে ওটা আমার জন্য নির্ধারিত করে দাও এবং সহজ করে দাও। অতঃপর ওতে আমার জন্য বরকত দান কর।

আর যদি তুমি জানো যে, এ কাজটি আমার জন্য মন্দ হবে আমার দ্বীনের জন্য, আমার জীবিকার জন্য ও আমার পরিণাম ফলের জন্য, তাহ’লে এটা আমার থেকে ফিরিয়ে নাও এবং আমাকেও ওটা থেকে ফিরিয়ে রাখ। অতঃপর আমার জন্য মঙ্গল নির্ধারণ কর, যেখানে তা আছে এবং আমাকে তা দ্বারা সন্তুষ্ট কর’।

এখানে হা-যাল আম্রা (এই কাজ) বলার সময় কাজের নাম উল্লেখ করা যায় বলে রাবী বর্ণনা করেন। যা উপরোক্ত হাদীছের শেষে বর্ণিত হয়েছে। [2]

দো‘আর সময়কাল :

এখানে দো‘আটি কখন পড়বে, সে বিষয়ে দু’টি বিষয় প্রতিভাত হয়। ১. জাবের (রাঃ) বর্ণিত বুখারীর হাদীছে এসেছে ثُمَّ لْيَقُلْ ‘অতঃপর সে যেন বলে’। এতে বুঝা যায় যে, সালাম ফিরানোর পরে দো‘আ করবে। ২. একই রাবী বর্ণিত আবুদাঊদের হাদীছে এসেছে وَلْيَقُلْ ‘এবং সে যেন বলে’। এতে বুঝা যায় যে, ছালাতের মধ্যে দো‘আ করবে। [3] অন্যান্য ছহীহ হাদীছে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছালাতের মধ্যেই বিশেষ করে সিজদায় এবং শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ ও সালামের মধ্যবর্তী সময়ে বিশেষ দো‘আ সমূহ করতেন।[4] সে হিসাবে ইস্তেখারাহর দো‘আটিও শেষ বৈঠকে বসে ধীরে-সুস্থে করা বাঞ্ছনীয়। আর যদি সালাম ফিরানোর পরে উক্ত দো‘আ করেন, তাহ’লে বেশী দেরী না করে এবং অহেতুক কোন কথা না বলে সত্বর দু’হাত উঠিয়ে দো‘আ করবেন এবং শুরুতে হাম্দ ও দরূদ পাঠ করবেন। যেমন আল-হামদুলিল্লাহি রবিবল ‘আ-লামীন, ওয়াছছালাতু ওয়াসসালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহিল কারীম, অতঃপর দো‘আ পাঠ করবেন। [5]

ছাহেবে মির‘আত বলেন, ইস্তেখারাহর পরে যেটা প্রকাশিত হয় বা ঘটে যায়, সেটাই করা উচিত। এজন্য তাকে ঘুমিয়ে যাওয়া এবং স্বপ্ন দেখা বা কাশ্ফ হওয়া অর্থাৎ হৃদয় খুলে যাওয়া শর্ত নয়।[6]

একটি বিষয়ের জন্য একবার ব্যতীত একাধিকবার ‘ছালাতুল ইস্তেখা-রাহ’ আদায়ের কথা স্পষ্টভাবে কোন ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কখনো দো‘আ করলে একই সময়ে তিনবার করে দো‘আ করতেন এবং কিছু চাইলে তিনবার করে চাইতেন।[7]

এই ছহীহ হাদীছের উপরে ভিত্তি করে ইস্তেখারাহর দো‘আ পাঠের উদ্দেশ্যে অত্র ছালাত ইস্তিসক্বার ছালাতের ন্যায় একাধিকবার পড়া যায় বলে ইমাম শাওকানী মন্তব্য করেছেন। ইমাম নববী বলেন, উক্ত দো‘আ পাঠের সময় হৃদয়কে যাবতীয় ঝোঁক প্রবণতা হ’তে খালি করে নিতে হবে এবং সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর উপরে তাওয়াক্কুল করতে হবে। নইলে ঐ ব্যক্তি আল্লাহর নিকটে কল্যাণপ্রার্থী না হয়ে বরং নিজের প্রবৃত্তির পূজারী হিসাবে গণ্য হবে। [8]


[1] . নায়লুল আওত্বার ৩/৩৫৪, ‘ইস্তেখা-রাহ্’র ছালাত’ অনুচ্ছেদ।
[2] . অথবা বলবে, (فِىْ عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ অর্থাৎ আমার ইহকাল ও পরকালের জন্য)। বুখারী, মিশকাত হা/১৩২৩ ‘ঐচ্ছিক ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩৯; আবুদাঊদ হা/১৫৩৮; মির‘আত ৪/৩৬২।
[3] . বুখারী হা/১১৬২, আবুদাঊদ হা/১৫৩৮; মির‘আত ৪/৩৬২।
[4] . মুসলিম, মিশকাত হা/৮৯৪, ৮১৩।
[5] . আবুদাঊদ হা/১৪৮১, ৮৮-৯০; নায়ল ৩/৩৫৪-৫৫; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৫৮; মির‘আত ৪/৩৬২, ৬৪।
[6] . মির‘আত ৪/৩৬৫।
[7] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৫৮৪৭, ‘ফাযায়েল ও শামায়েল’ অধ্যায়-২৯, অনুচ্ছেদ-৪।
[8] . নায়লুল আওত্বার ৩/৩৫৬, ‘ইস্তেখা-রাহর ছালাত’ অনুচ্ছেদ।

১৩. ছালাতুত তাসবীহ (صلاة التسبيح)


অধিক তাসবীহ পাঠের কারণে এই ছালাতকে ‘ছালাতুত তাসবীহ’ বলা হয়। এটি ঐচ্ছিক ছালাত সমূহের অন্তর্ভুক্ত।

এ বিষয়ে কোন ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়নি। বরং আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বর্ণিত এ সম্পর্কিত হাদীছকে কেউ ‘মুরসাল’ কেউ ‘মওকূফ’ কেউ ‘যঈফ’ কেউ ‘মওযূ’ বা জাল বলেছেন। সঊদী আরবের স্থায়ী ফৎওয়া কমিটি ‘লাজনা দায়েমাহ’ এই ছালাতকে বিদ‘আত বলে ফৎওয়া দিয়েছে। যদিও শায়খ আলবানী (রহঃ) উক্ত হাদীছের যঈফ সূত্র সমূহ পরস্পরকে শক্তিশালী করে মনে করে তাকে ‘ছহীহ’ বলেছেন এবং ইবনু হাজার আসক্বালানী ও ছাহেবে মির‘আত একে ‘হাসান’ স্তরে উন্নীত বলেছেন। তবুও এরূপ বিতর্কিত, সন্দেহযুক্ত ও দুর্বল ভিত্তির উপরে কোন ইবাদত বিশেষ করে ছালাত প্রতিষ্ঠা করা যায় না বিধায় ‘হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’-এর ‘দারুল ইফতা’ বিষয়টি থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। [1]

[1] . দ্রঃ ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ)-এর বিস্তারিত আলোচনা; আলবানী, মিশকাত পরিশিষ্ট, ৩ নং হাদীছ ৩/১৭৭৯-৮২ পৃঃ; আবুদাঊদ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৩২৮ হাশিয়া; বায়হাক্বী ৩/৫২; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, মাসায়েলে ইমাম আহমাদ, মাসআলা নং ৪১৩, ২/২৯৫ পৃঃ; মির‘আত ৪/৩৭২-৭৫; রিয়াদ : লাজনা দায়েমাহ, (صلاة التسبيح بدعة، وحديثها ليس بثابت، بل هو منكر)। ফৎওয়া নং ২১৪১, ৮/১৬৪ পৃঃ। নিয়ম : দিনে বা রাতে চার রাক‘আত ছালাত এক সালামে আদায় করবে। ১ম রাক‘আতে ক্বিরাআত শেষে সুবহা-নাল্লা-হি, ওয়াল হামদুলিল্লা-হি, অলা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু, ওয়াল্লাহ-হু আকবর ১৫ বার পড়বে। অতঃপর রুকূতে গিয়ে (দো‘আ পাঠ শেষে) উক্ত তাসবীহ ১০ বার পড়বে। অতঃপর রুকূ থেকে উঠে (সামি‘আল্লাহু লেমান হামিদাহ ও রববানা লাকাল হামদ বলার পর) ১০ বার পড়বে। অতঃপর সিজদায় গিয়ে (দো‘আ পাঠের পর) ১০ বার পড়বে। অতঃপর সিজদা থেকে উঠে (দো‘আ পাঠের পর) ১০ বার পড়বে। অতঃপর দ্বিতীয় সিজদায় গিয়ে (দো‘আ পাঠের পর) ১০ বার পড়বে। অতঃপর উঠে দাঁড়ানোর পূর্বে বসা অবস্থায় ১০ বার পড়বে (মোট ৭৫ বার)। এইভাবে চার রাক‘আতে সর্বমোট তাসবীহ ৪Î৭৫=৩০০ বার পড়বে। পারলে দিনে একবার, নইলে সপ্তাহে, নইলে মাসে, নইলে বছরে, নইলে জীবনে একবার পড়বে। তাতে আগে-পিছের, জানা-অজানা, ছোট-বড় সব গোনাহ মাফ হয়ে যাবে (আবুদাঊদ হা/১২৯৭-৯৯, ইবনু মাজাহ হা/১৩৮৬-৮৭; ঐ, মিশকাত হা/১৩২৮, ‘ছালাতুত তাসবীহ’ অনুচ্ছেদ-৪০)। জরুরী দো‘আ সমূহ (الأدعية الضرورية) দো‘আর গুরুত্ব : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ ‘দো‘আ হ’ল ইবাদত’।[1] আল্লাহ বলেন,اُدْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ، إِنَّ الَّذِيْنَ يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِيْ سَيَدْخُلُوْنَ جَهَنَّمَ دَاخِرِيْنَ- (غافر60)- ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। যারা অহংকার বশে আমার ইবাদত হ’তে বিমুখ হয়, সত্বর তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত অবস্থায়’। এখানে ‘ইবাদত’ অর্থ দো‘আ।[2] আল্লাহ আরও বলেন, وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيْبٌ أُجِيْبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيْبُوْا لِي وَلْيُؤْمِنُوْا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُوْنَ- (البقرة 186)- ‘আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে আমার বিষয়ে জিজ্ঞেস করে, তখন বলে দাও যে, আমি তাদের অতীব নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর আহবানে সাড়া দিয়ে থাকি, যখন সে আমাকে আহবান করে। অতএব তারা যেন আমার আদেশ সমূহ পালন করে এবং আমার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে। যাতে তারা সুপথ প্রাপ্ত হয়’ (বাক্বারাহ ২/১৮৬)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ لَمْ يَدْعُ اللهَ سُبْحَانَهُ غَضِبَ عَلَيْهِ ‘যে ব্যক্তি মহান আল্লাহকে ডাকে না, তিনি তার উপরে ক্রুদ্ধ হন’। [3] তিনি বলেন, لَيْسَ شَىْءٌ أَكْرَمَ عَلَى اللهِ سُبْحَانَهُ مِنَ الدُّعَاءِ ‘মহান আল্লাহর নিকট দো‘আর চাইতে অধিক মর্যাদাপূর্ণ বিষয় আর কিছু নেই’।[4] দো‘আর ফযীলত : হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘মুসলমান যখন অন্য কোন মুসলমানের জন্য দো‘আ করে, যার মধ্যে কোনরূপ গোনাহ বা আত্মীয়তা ছিন্ন করার কথা থাকে না, আল্লাহ পাক উক্ত দো‘আর বিনিময়ে তাকে তিনটির যেকোন একটি দান করে থাকেন। (১) তার দো‘আ দ্রুত কবুল করেন অথবা (২) তার প্রতিদান আখেরাতে প্রদান করার জন্য রেখে দেন অথবা (৩) তার থেকে অনুরূপ আরেকটি কষ্ট দূর করে দেন। একথা শুনে ছাহাবীগণ উৎসাহিত হয়ে বললেন, তাহ’লে আমরা বেশী বেশী দো‘আ করব। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আল্লাহ তার চাইতে আরও বেশী দো‘আ কবুলকারী’।[5] এজন্য সর্বদা পরস্পরের নিকট দো‘আ চাইতে হবে। দো‘আ কবুলের শর্তাবলী : (১) শুরুতে এবং শেষে হামদ ও দরূদ পাঠ করা (২) দো‘আ আল্লাহর প্রতি খালেছ আনুগত্য সহকারে হওয়া (৩) দো‘আয় কোন পাপের কথা কিংবা আত্মীয়তা ছিন্ন করার কথা না থাকা (৪) খাদ্য-পানীয় ও পোষাক হালাল ও পবিত্র হওয়া (৫) দো‘আ কবুলের জন্য ব্যস্ত না হওয়া (৬) নিরাশ না হওয়া ও দো‘আ পরিত্যাগ না করা (৭) উদাসীনভাবে দো‘আ না করা এবং দো‘আ কবুলের ব্যাপারে সর্বদা দৃঢ় আশাবাদী থাকা। তবে আল্লাহ ইচ্ছা করলে যে কোন সময় যে কোন বান্দার এমনকি কাফের-মুশরিকের দো‘আও কবুল করে থাকেন, যদি সে অনুতপ্ত হৃদয়ে ক্ষমা চায়। নিয়ম : খোলা দু’হস্ততালু একত্রিত করে চেহারা বরাবর সামনে রেখে দো‘আ করবে।[6] দো‘আর শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করবে। অতঃপর বিভিন্ন দো‘আ পড়বে।[7] যেমন,আল-হামদু লিল্লা-হি রবিবল ‘আ-লামীন, ওয়াছছালাতু ওয়াসসালা-মু ‘আলা রাসূলিহিল কারীম’ বলার পর বিভিন্ন দো‘আ শেষে ‘সুবহা-না রবিবকা রবিবল ‘ইযযাতি ‘আম্মা ইয়াছিফূন, ওয়া সালা-মুন ‘আলাল মুরসালীন, ওয়াল হামদু লিল্লা-হি রবিবল ‘আ-লামীন’ পাঠ অন্তে দো‘আ শেষ করবে। দো‘আর আদব : (১) কাকুতি-মিনতি সহকারে ও গোপনে হওয়া।[8] (২) একমনে ভয় ও আকাংখা সহকারে এবং অনুচ্চ শব্দে অথবা মধ্যম স্বরে হওয়া।[9] (৩) সারগর্ভ ও তাৎপর্যপূর্ণ হওয়া।[10] দো‘আ কবুলের স্থান ও সময় : আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’।[11] এতে বুঝা যায় যে, যে কোন স্থানে যে কোন সময় যে কোন ভাষায় আল্লাহকে ডাকলে তিনি সাড়া দিবেন। তবে ছালাতের মধ্যে আরবী ব্যতীত অন্য ভাষায় দো‘আ করা যাবে না। দো‘আর জন্য হাদীছে বিশেষ কিছু স্থান ও সময়ের ব্যাপারে তাকীদ এসেছে, যেগুলি সংক্ষেপে বর্ণিত হ’ল : (১) কুরআনী দো‘আ ব্যতিরেকে হাদীছে বর্ণিত দো‘আ সমূহের মাধ্যমে সিজদায় দো‘আ করা (২) শেষ বৈঠকে তাশাহ্হুদ ও সালামের মধ্যবর্তী সময়ে (৩) জুম‘আর দিনে ইমামের মিম্বরে বসা হ’তে সালাম ফিরানো পর্যন্ত সময়কালে (৪) রাত্রির নফল ছালাতে (৫) ছিয়াম অবস্থায় (৬) রামাযানের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ বেজোড় রাত্রিগুলিতে (৭) ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ে উঠে বায়তুল্লাহর দিকে মুখ করে দু’হাত উঠিয়ে (৮) হজ্জের সময় আরাফা ময়দানে দু’হাত উঠিয়ে (৯) মাশ‘আরুল হারাম অর্থাৎ মুযদালিফা মসজিদে অথবা বাইরে স্বীয় অবস্থান স্থলে ১০ই যিলহাজ্জ ফজরের ছালাতের পর হ’তে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত দো‘আ করা (১০) ১১, ১২ ও ১৩ই যিলহাজ্জ তারিখে মিনায় ১ম ও ২য় জামরায় কংকর নিক্ষেপের পর একটু দূরে সরে গিয়ে দু’হাত উঠিয়ে দো‘আ করা (১১) কা‘বাগৃহের ত্বাওয়াফের সময় রুকনে ইয়ামানী ও হাজারে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে। (১২) ‘কারু পিছনে খালেছ মনে দো‘আ করলে, সে দো‘আ কবুল হয়। সেখানে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকেন। যখনই ঐ ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য দো‘আ করে, তখনই উক্ত ফেরেশতা ‘আমীন’ বলেন এবং বলেন তোমার জন্যও অনুরূপ হৌক’।[12] এতদ্ব্যতীত অন্যান্য আরও কিছু স্থানে ও সময়ে। তিন ব্যক্তির দো‘আ নিশ্চিত কবুল হয় : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, তিন ব্যক্তির দো‘আ নিশ্চিতভাবে কবুল হয়, এতে কোন সন্দেহ নেই (১) মাযলূমের দো‘আ (২) মুসাফিরের দো‘আ (৩) সন্তানের জন্য পিতার দো‘আ।[13] তিনি বলেন, ‘ তোমরা মাযলূমের দো‘আ হ’তে সাবধান থাকো। কেননা তার দো‘আ ও আল্লাহর মধ্যে কোন পর্দা নেই’। [14] [1] . তিরমিযী, আবুদাঊদ প্রভৃতি, মিশকাত হা/২২৩০ ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৯, পরিচ্ছেদ-২। [2] . গাফের/মুমিন ৪০/৬০; ‘আওনুল মা‘বূদ হা/১৪৬৬-এর ব্যাখ্যা, ‘দো‘আ’ অনুচ্ছেদ-৩৫২। [3] . ইবনু মাজাহ হা/৩৮২৭ ‘দো‘আ’ অধ্যায়-৩৪, ‘দো‘আর মর্যাদা’ অনুচ্ছেদ-১। [4] . তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, হাদীছ হাসান, মিশকাত হা/২২৩২, ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৯, পরিচ্ছেদ-২। [5] . আহমাদ, হাকেম, মিশকাত হা/২২৫৯ ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৯; সনদ হাসান -আলবানী; হাদীছ ছহীহ, আহমাদ হাসান দেহলভী, তানক্বীহুর রুওয়াত ফী তাখরীজি আহাদীছিল মিশকাত (লাহোর: দারুদ দা‘ওয়াতিস সালাফিইয়াহ, ১৯৮৩), ২/৬৯ পৃঃ। [6] . আবুদাঊদ হা/১৪৮৬-৮৭, ৮৯; ঐ, মিশকাত হা/২২৫৬ ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৯। [7] . আবুদাঊদ হা/১৪৮১; তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত হা/৯৩০-৩১ ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ ও তার ফযীলত’ অনুচ্ছেদ-১৬; আলবানী, ছিফাত ১৬২ পৃঃ। [8] . আ‘রাফ ৭/৫৫। [9] . আ‘রাফ ৭/৫৬, ২০৫; যুমার ৩৯/৫৩-৫৪; ইসরা ১৭/১১০। [10] . আবুদাঊদ হা/১৪৮২; ঐ, মিশকাত হা/২২৪৬, ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৯। [11] . গাফের/মুমিন ৪০/৬০। [12] . মুসলিম, মিশকাত হা/২২২৮, ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৯, পরিচ্ছেদ-১। [13] . আবুদাঊদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/২২৫০, ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়-৯, পরিচ্ছেদ-২; ছহীহাহ হা/৫৯৬। [14] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৭৭২, ‘যাকাত’ অধ্যায়-৬, পরিচ্ছেদ-১। আরও পড়ুনঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায আদায়ের পদ্ধতি আরও পড়ুনঃ সালাত আদায়ের পদ্ধতি আরও পড়ুনঃ সালাতের আহকাম ও পদ্ধতি  আরও পড়ুনঃ ছহীহ্‌ সুন্নাহ্‌র আলোকে বিতর নামায আরও পড়ুনঃ কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে রাতের সালাত আরও পড়ুনঃ জামা‌‘আতের সাথে নামায আদায় আরও পড়ুনঃ সালাত পরবর্তী দুয়া ও জিকির সমূহ আরও পড়ুনঃ নামাযে প্রচলিত ভুল-ত্রুটি (ওযুর ভুল-ত্রুটি সহ) আরও পড়ুনঃ কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেগুলো নামাজ পড়া অবস্থায় অবহেলা করা হয় আরও পড়ুনঃ সালাতে বিনয়ী হওয়ার তেত্রিশ উপায় (১ম পর্ব) আরও পড়ুনঃ সালাতে বিনয়ী হওয়ার তেত্রিশ উপায় (২য় পর্ব) আরও পড়ুনঃ সালাতে একাগ্রতা ও খুশু আরও পড়ুনঃ সালাতে তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া অন্যত্র হাত উত্তোলন প্রসঙ্গে একটি প্রশ্নের জবাব আরও পড়ুনঃ সালাত বর্জনকারীর বিধান আরও পড়ুনঃ ফতোওয়া সালাত: নামায সম্পর্কে অতি গুরুত্বপূর্ণ ১৭০টি প্রশ্নোত্তর আরও পড়ুনঃ কেউ যদি তার যিম্মায় থাকা (ছুটে যাওয়া) সালাতের ও ফরয সাওমের সংখ্যা মনে করতে না পারে, তবে সে কী করবে? ডাউনলোড করুনঃ বইঃ রাসূল (সা)-এর নামায (ফ্রি ডাউনলোড) ডাউনলোড করুনঃ বইঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সালাত সম্পাদনের পদ্ধতি – ফ্রি ডাউনলোড ডাউনলোড করুনঃ বইঃ ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) – ফ্রি ডাউনলোড ডাউনলোড করুনঃ বইঃ সালাতুত তারাবীহ – ফ্রি ডাউনলোড ডাউনলোড করুনঃ বইঃ তারাবীহ ও ই’তিকাফ – ফ্রি ডাউনলোড “সালাত” বিষয়ের উপর আরও পড়তে এইখানে ক্লিক করুন।

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না কিন্তু।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s